চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল কৃষি খাতের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই দেশের আটটি বড় জেলায় ১৯ হাজার ৮৬৯ হেক্টর ফসলি জমি পুরোপুরি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, এটি কেবল প্রাথমিক মূল্যায়নের একটি খতিয়ান মাত্র। মাঠপর্যায়ের বন্যা ও জমে থাকা পানি সম্পূর্ণ নিষ্কাশিত হয়ে গেলে কৃষির এই ক্ষয়ক্ষতির আসল চিত্র এবং চূড়ান্ত আর্থিক পরিমাণ আরও কয়েক গুণ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং কৃষকদের বাঁচাতে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকারের কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, তৃণমূলের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড ভিত্তিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, যা শেষ হবামাত্রই দ্রুত সরকারি অনুদান বিতরণ করা হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বানের পানিতে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদ একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত শনিবার দক্ষিণ-পূর্বের বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে দেখা গেলেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ওই দিন দেশের ছয়টি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত গুরুত্বপূর্ণ ৪টি নদীর পানি মারাত্মকভাবে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছিল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া এই আটটি জেলার তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ ও হবিগঞ্জ। এই উপদ্রুত জেলাগুলোতে আবাদ করা মোট ২ লাখ ৮৮group হাজার ৫৯ হেক্টর জমির মধ্যে ২ লাখ ৮০ হাজার ৩৮৪ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল দণ্ডায়মান অবস্থায় ছিল, যার মধ্যে সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি আবাদি জমি বানের পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষকের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন আউশ ধান এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের পুষ্টির জোগান দেওয়া গ্রীষ্মকালীন সবজি। মাঠের মোট ৯১ হাজার ৭১০ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৯ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে ৪৩ হাজার ৯৭৯ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে মাঠের ৩৬ হাজার ৩০৪ হেক্টর জমির আবাদ প্লাবিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৩৭৯ হেক্টর জমির সবজি পচে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি চাষিদের জন্য বড় বিপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে আমন বীজতলার ক্ষতি। মোট ৭ হাজার ২৯২ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ১ হাজার ২৬২ হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, এর নেতিবাচক প্রভাব আগামী আমন মৌসুমের চারা রোপণ প্রক্রিয়ার ওপর সরাসরি পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
আঞ্চলিক ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমতলের চেয়ে উপকূল ও পাহাড়ি জেলাগুলোতে ধ্বংসের মাত্রা অনেক বেশি। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় আবাদ করা ২৮group হাজার ৮৩ হেক্টর আউশের মধ্যে ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর, ১৭ হাজার ৬৭৮ হেক্টর সবজির মধ্যে ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর এবং ২ হাজার ৬০৯ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৫৬৫ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। প্রতিবেশী কক্সবাজার জেলায় ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমি এবং ৫১০ হেক্টর জমির সবজি সরাসরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া জেলাটিতে ৮৯৫ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ২৪৫ হেক্টর এবং উপকূলীয় অর্থকরী ফসল ৩ হাজার ৬৫ হেক্টর জমির পানের বরজের মধ্যে ১১৬ হেক্টরের আবাদ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পার্বত্য জেলাগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও সমতলের চেয়ে কম নয়। দুর্গম রাঙামাটিতে ৭১৭ হেক্টরের আউশ ধান, ৯৮৭ হেক্টর সবজি, ৭৪৫ হেক্টরের আদা এবং ৬৪৮ হেক্টরের হলুদের ক্ষেত পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়িতে ১৩৮ হেক্টর আউশ, ১৪৩ হেক্টর সবজি, ২০২ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ৫৪৮ হেক্টর জমির মূল্যবান ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবানে আউশ আবাদের ২২০।৭ হেক্টর এবং সবজির ৪৫০।১ হেক্টর জমি বানের পানিতে ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া সমতলের ২২২ হেক্টর ফলবাগান, ২১ হেক্টর আমন বীজতলা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের ৫।৭ হেক্টর ফলবাগানের পাশাপাশি জুম আউশ ৩।৯ হেক্টর, আদা ২।১ হেক্টর এবং হলুদ ৩।১ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সমতলের জেলা সিরাজগঞ্জের যমুনা অববাহিকায় পাটের ৫৮ হেক্টর, সবজির ২৭ হেক্টর, আমন বীজতলার ৭০ হেক্টর এবং মরিচের ৪ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জে ৫০০ হেক্টর আউশ ও ৯৫ হেক্টর সবজি এবং সুনামগঞ্জের ১০ হেক্টর আউশ জমি এখনো জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে।
কৃষির এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামের বন্যাদুর্গত এলাকায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, যেখানে আইএসপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী সেনাসদস্যরা নিরলসভাবে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন। এরই মাঝে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে এক দুঃখজনক খবর এসেছে। সেখানে বাড়ির সামনে হঠাৎ আসা বানের পানির তীব্র স্রোতের ধাক্কায় কৈয়ারবিল ছড়া খালের পানিতে তিনজন ভেসে যান, যাদের মধ্যে দুজন প্রাণে বাঁচলেও সজিব জলদাস নামের এক ১২ বছরের শিশু ৯ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পরও নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে কক্সবাজারের সাথে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সরাসরি রেল যোগাযোগ। চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনের বিভিন্ন অংশ বানের পানিতে ডুবে থাকায় এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বঙ্গোপসাগরে প্রচণ্ড উত্তাল পরিস্থিতির কারণে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌ রুটে টানা আট দিন ধরে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রলার ও সাধারণ নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে চিকিৎসা, জরুরি সদাই ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডে এসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ১৫৯ জন বাসিন্দা। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস। এম। অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, শনিবার সাগর কিছুটা শান্ত হওয়ায় এই আটকে পড়া দ্বীপবাসীদের বিশেষ অনুমতিতে ট্রলারে করে দ্বীপে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের ওপরও এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে; টেকনাফের উত্তর নাইটংপাড়ার শিয়াল্যাঘোনায় প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড় থেকে পা পিছলে পড়ে একটি বন্যহাতি গুরুতর আহত হয়েছে, যাকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এই সামগ্রিক সংকটের মুখে দেশের কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। কুমিল্লা টাউন হল মাঠে জেলা প্রশাসনের একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, তা চূড়ান্ত হবামাত্রই ক্ষতির ধরন অনুযায়ী সরকারি তহবিল থেকে বিনামূল্যে উন্নত বীজ, সার এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হবে, যেন প্রান্তিক চাষিরা দ্রুত পুনরায় কৃষিকাজে ফিরতে পারেন।
তবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পানি কিছুটা কমলেও উত্তরাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা ধীরগতির উন্নতি লক্ষ্য করা গেলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ সিলেট, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। দেশের চট্টগ্রাম, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার ৪টি নদী এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর সিলেট ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপরে এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ১৭ সেন্টিমিটার ওপরে বইছে। মনু নদীর পানি মৌলভীবাজারে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপরে বইছে। এছাড়া সারি, গোয়াইন, সোমেশ্বরী ও কংস নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পেয়ে নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলোকে প্লাবিত করেছে। একই সাথে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলেও একটি স্বল্পমেয়াদি নতুন বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ