• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

প্রাণ দিয়ে ‘ভাতের দাম’ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মানব সভ্যতার আদিমতম চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি হলো ক্ষুধা নিবারণ করা। কিন্তু এক প্লেট ভাতের মূল্য যে কাউকে নিজের জীবনের বিনিময়ে চোকাতে হতে পারে, তা হয়তো আধুনিক সমাজব্যবস্থায় কল্পনারও অতীত। খুলনায় এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের সেই অকল্পনীয় ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মেসের খাতায় ‘মিল’ বা আগাম হিসাব না দিয়ে সামান্য ভাত খাওয়ার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতনের সূত্রপাত হয়, তার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে এক তরুণকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে। সহপাঠী ও মেসের অন্য সদস্যদের সংঘবদ্ধ নির্মমতা, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে এই ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে।
নিহত তরুণের নাম মো. আজমল হোসেন। তিনি খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী ছিলেন। তার পৈতৃক নিবাস চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা উপজেলার বড় শোলুয়া গ্রামে। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় পরিবার তাকে খুলনায় পড়তে পাঠিয়েছিল। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) হলরোড সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় আকিব নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে ভাড়া দেওয়া একটি ছাত্রাবাস বা মেসে থাকতেন আজমল। মেসজীবনের কিছু অলিখিত ও লিখিত নিয়ম থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হলো যেকোনো বেলায় খাবার খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে দায়িত্বপ্রাপ্তদের তা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু ঘটনার দিন শুক্রবার রাতে ক্ষুধার তাড়নায় হোক বা ভুলবশত, খাবারের বিষয়টি আগাম নিশ্চিত না করেই মেসের অন্য একজনের ভাত খেয়ে ফেলেন আজমল। আর এই সামান্য ভাতের অধিকার নিয়েই শুরু হয় অভাবনীয় এক উন্মত্ততা। ভাত খাওয়ার অপরাধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মেসের অন্য সদস্যরা, যা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় পাশবিক নির্যাতনে।
তুচ্ছ কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু হওয়া এই বিরোধ দ্রুতই চরম আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে আজমলকে জোরপূর্বক ওই পাঁচতলা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতের অন্ধকারে সেই ছাদ পরিণত হয় এক ভয়ংকর নির্যাতন কেন্দ্রে। সেখানে তাকে আটকে রেখে সংঘবদ্ধভাবে বেদম মারধর করা হয়। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নিপীড়নের চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে তার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। এক মুঠো ভাতের জন্য একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণকে তার সমবয়সী বা সহপাঠীদের হাতে এভাবে চরম লাঞ্ছনা ও শারীরিক প্রহারের শিকার হতে হবে, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক সহনশীলতার ভিত্তিকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই অমানবিক নির্যাতনের একপর্যায়ে পাঁচতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান আজমল। পরবর্তীতে গুরুতর আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর আগে আজমলের সঙ্গে তার জন্মদাতা পিতার যে শেষ ফোনালাপ হয়েছিল, তা যেকোনো পাষাণ হৃদয়কেও কাঁদিয়ে তুলবে। শুক্রবার রাতে মেসের সেই নির্যাতন কেন্দ্র থেকে প্রাণ বাঁচানোর শেষ আকুতি নিয়ে আজমল তার বাবা কুতুবউদ্দিনকে ফোন করেছিলেন। অসহায় সন্তান আর্তনাদ করে বলেছিলেন, “বাবা, আমি ভাত খেয়েছি বলে ওরা আমাকে মারধর করছে।” মেসের উন্মত্ত সদস্যরা কেবল ভাত খাওয়ার অভিযোগেই থেমে থাকেনি, নিজেদের বর্বরতাকে বৈধতা দিতে আজমলের বিরুদ্ধে টাকা ও জিনিসপত্র চুরির অপবাদও জুড়ে দেয়। পিতার সঙ্গে ফোনালাপের একপর্যায়ে রিফাত নামের এক যুবক ফোনটি কেড়ে নেন। তিনি অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় আজমলের বাবাকে জানান যে, তার ছেলে নাকি ২৩শ টাকা চুরি করেছে। এই কথিত চুরির বিচার হিসেবে তিনি আজমলের বাবার কাছে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ বা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন এবং তাকে দ্রুত সেখানে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন।
একজন অসহায় পিতা দূর থেকে সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন। তিনি টাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে ওই রাতের মতো ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু পাষণ্ডদের মন গলেনি। এরপর থেকেই ছেলের মোবাইল ফোনটি চিরতরে বন্ধ পান পিতা কুতুবউদ্দিন। এক বুক হাহাকার নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, তার ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনি এখন কেবল সৃষ্টিকর্তার কাছেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইছেন। অন্যদিকে সন্তানের ক্ষতবিক্ষত লাশ দেখে আজমলের মায়ের যে বুকফাটা আর্তনাদ, তা গোটা সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার ছেলের শরীরের এমন কোনো স্থান বাকি নেই যেখানে আঘাত করা হয়নি; পিটিয়ে পুরো শরীর কালচে করে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দাও ঘটনার ভয়াবহতা নিশ্চিত করে জানান, রাতে বিকট শব্দ শুনে বাইরে গিয়ে তিনি আজমলকে পড়ে থাকতে দেখেন এবং ভ্যানে তোলার সময় তার সারা শরীরে আঘাতের অসংখ্য কালচে দাগ স্পষ্ট দেখতে পান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে কয়েকজন যুবক আজমলকে গুরুতর আহত অবস্থায় খুমেক হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সে সময় তারা দাবি করেন যে, আজমল ভবনের পাঁচতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। মেসের একাধিক শিক্ষার্থীর ভাষ্যমতে, চুরির বিষয়ে তথাকথিত ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ করার জন্যই আজমলকে ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শুরুতে সেখানে ১০-১২ জন উপস্থিত থাকলেও পরে আরও অনেকেই জড়ো হন। তাদের দাবি, মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ছাদের একটি পিচ্ছিল অংশ থেকে আজমল নিজেই লাফ দেন, তখন তাকে বাঁচানোর কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীর বর্ণনায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র। তিনি জানান, মোবাইল ফোনে লাউডস্পিকারে আজমলকে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করা হয় এবং চুরির স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। এই বহুমুখী ও সাংঘর্ষিক বর্ণনাগুলো ঘটনার পেছনের প্রকৃত সত্যকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের হরিণটানা থানা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ প্রশাসন এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে যে, বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে আজমল কি নিজেই ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলেন, নাকি নির্যাতনকারীরা তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে হত্যা করেছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধারের জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে শনিবার ময়নাতদন্ত শেষে আজমলের প্রাণহীন দেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সুবিচার পাওয়ার আশায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে হরিণটানা থানায় একটি আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা মামলার সূত্র ধরে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, যেহেতু ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের বাইরে একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন মেসে ঘটেছে, তাই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি কোনো আইনি এখতিয়ার নেই। তবে তারা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং তদন্তকাজে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করছেন। এই ধরনের বক্তব্য আইনি দিক থেকে হয়তো সঠিক, কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর এমন অকাল মৃত্যুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক দায়বদ্ধতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
আজমলের এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক স্খলনের এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আসা একদল তরুণ যখন নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় সহপাঠীকে নির্যাতন করে, তখন বুঝতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। সামান্য এক প্লেট ভাত কিংবা প্রমাণহীন চুরির অভিযোগের ভিত্তিতে একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এই পৈশাচিক অধিকার তাদের কে দিয়েছে, সেই প্রশ্ন আজ পুরো সমাজের। আজমলের বাবা-মায়ের সারা জীবনের স্বপ্ন আজ একটি কফিনে বন্দি। এমন নির্মমতার যদি দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা না যায়, তবে মেস বা আবাসিক হলগুলোতে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চিরকালই হুমকির মুখে থেকে যাবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে এই বর্বরতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন আর কোনো পিতাকে এক প্লেট ভাতের অপরাধে সন্তানের মৃত্যুর খবর শুনতে না হয়।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category