• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে মেগা বরাদ্দ

Reporter Name / ৭ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে নতুন সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে এ খাতে মোট বরাদ্দের পরিমাণ এক লাফে বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা এবং তার আগের অর্থবছরে ছিল ১ লাখ ৩৬ Wave ২৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ৭ মে সচিবালয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি এবং অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং মাথাপিছু ভাতার হার চূড়ান্ত করা হয়েছে। গত ২০ মে অর্থমন্ত্রী এই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর করেন।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের দীর্ঘদিনের প্রধান সমস্যা হলো ভুল উপকারভোগী নির্বাচন, কম ভাতার হার, সমন্বয়ের অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় নানাবিধ অনিয়ম। প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে যাতে রাষ্ট্রের এই অর্থ সঠিকভাবে পৌঁছায়, সে জন্য এবার প্রযুক্তিগত কঠোরতা অবলম্বন করছে সরকার। আগামী অর্থবছর থেকে সামাজিক সুরক্ষার যেকোনো সুবিধা পেতে হলে সুবিধাভোগীদের আবশ্যিকভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন এবং তাদের অভিভাবকদের এনআইডি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবার প্রথমবারের মতো ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)’ নামক একটি সর্বাধুনিক অনলাইন তথ্যভাণ্ডার ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। এর মাধ্যমে ভুয়া সুবিধাভোগীদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব হবে, যা এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করবে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নতুন আটটি কর্মসূচি যুক্ত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্তৃক গত ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হওয়া ফ্যামিলি কার্ড মেগা প্রকল্পের আওতায় আগামী অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে কার্ড দেওয়া হবে। প্রতি পরিবার মাসে ২,৫০০ টাকা করে পাবেন, যাতে বছরে সরকারের ব্যয় হবে ১২,৩৭৪ কোটি টাকা। আগামী ৫ বছরে ১ কোটি ৬১ লাখ পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের সম্মানার্থে মোট ১৬,৫১৩ জন উপকারভোগীকে মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৮৪৪টি শহীদ পরিবার এবং ‘এ’ শ্রেণির গুরুতর আহত ১,৬০৭ জন প্রত্যেকে মাসে ২০,০০০ টাকা করে পাবেন। ‘বি’ শ্রেণির আহত ১,৬১৪ জন মাসে ১৫,০০০ টাকা এবং ‘সি’ শ্রেণির আহত ১২,৪৪৮ জন মাসে ১০,০০০ টাকা করে পাবেন। এ খাতে বার্ষিক বরাদ্দ ২৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পাশাপাশি দেশের ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ডের আওতায় এনে বছরে এককালীন ২,৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে, যাতে মোট ব্যয় হবে ১,০৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

নতুন কর্মসূচির মধ্যে আরও থাকছে ধর্মীয় উপাসনালয়ের কর্মীদের সম্মানী। দেশের ২ লাখ ৫৫,৬৬৬ জন ইমাম, পুরোহিত, বিহার অধ্যক্ষ এবং মুয়াজ্জিন, সেবাইত ও খাদেমদের জন্য বিশেষ মাসিক সম্মানী চালু হচ্ছে। ইমাম ও পুরোহিতরা মাসে ৫,০০০ টাকা, মুয়াজ্জিন ও সেবাইতরা ৩,০০০ টাকা এবং খাদেমরা ২,০০০ টাকা করে পাবেন। এছাড়া প্রধান ধর্মীয় উৎসবে ২,০০০ টাকা করে উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। ‘রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দুস্থ শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘কর্মহীন শ্রমিকদের সুরক্ষা কর্মসূচি’ করা হয়েছে। এর আওতায় ১৫,০০০ কর্মহীন শ্রমিককে মাসে ৫,০০০ টাকা করে সর্বোচ্চ ৩ মাস আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ভালনারেবল গ্রুপ (ভিজিএফ) এর আওতায় ১৫ লাখ উপকারভোগীকে ১ লাখ ১০ হাজার টন চালের অর্থনৈতিক মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে। এছাড়া গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ‘খাল খনন’ ও ‘বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে, যা সুরক্ষার সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন কর্মসূচির পাশাপাশি বিদ্যমান পুরোনো সামাজিক ভাতাগুলোর পরিধিও বাড়িয়েছে অর্থ বিভাগ। বয়স্ক ভাতা কার্যক্রমে বর্তমানে ৬১ লাখ উপকারভোগীকে ৬৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়, যা এখন ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হচ্ছে এবং উপকারভোগী বেড়ে হবে ৬২ লাখ। এতে মোট ব্যয় হবে ৫,২৩৯ কোটি টাকা। বিদ্যমান ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা কার্যক্রমের’ উপকারভোগী ১ লাখ বাড়িয়ে ৩০ লাখ করা হচ্ছে এবং তাঁদের ভাতাও ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে মোট ব্যয় হবে ২,৫৩৫ কোটি টাকা। প্রতিবন্ধী উপকারভোগী ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখ করা হচ্ছে এবং তাঁদের মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১,০০০ টাকা। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি ৮১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ করা হয়েছে এবং বৃত্তির হার স্তরভেদে বাড়িয়ে ১,০০০ থেকে ১,৪০০ টাকা করা হয়েছে, যাতে মোট ব্যয় বাড়বে ৮৭০ কোটি টাকা।

অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকাই থাকছে, তবে মা ও শিশুসহায়তা কর্মসূচির ভাতার হার ৮৫০ টাকা রাখলেও উপকারভোগী ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে করা হচ্ছে ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জন। ক্যানসার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের এককালীন চিকিৎসা সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হচ্ছে এবং উপকারভোগী ৬০ হাজার থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৬৫ হাজার। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাধারণ সম্মানী ২০,০০০ টাকা অপরিবর্তিত থাকলেও বীর প্রতীক, বীর বিক্রম, বীর উত্তম ও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সম্মানী বর্তমান হার থেকে একযোগে ৫,০০০ টাকা করে বাড়ানো হচ্ছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ২০১৫ সালের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী যদি উপকারভোগী নির্বাচনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করা যায় এবং দ্বৈততা দূর করা যায়, তবেই এই বিশাল তহবিলের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে। উল্লেখ্য, দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল বাজেট প্রস্তুত করছে অর্থ বিভাগ।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category