• শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন

বরাদ্দ ১০০ কোটি, খরচের ক্ষমতা শূন্য: পরিপত্রের গ্যাঁড়াকলে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকার দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ আমানতকারী প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্টের অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে| এই উদ্যোগকে বিচার বিভাগের আধুনিকায়নের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন| বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই অর্থ খরচের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বা প্রশাসনিক অনুমোদন সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হয়নি| ফলে, সরকারের নীতিগত সম্মতি ও অর্থ বরাদ্দ থাকার পরও আমলাতান্ত্রিক ও পরিপত্রের গ্যাঁড়াকলে আটকে আছে বিচার বিভাগের এই উন্নয়ন বাজেট| এই অচলাবস্থা নিরসনে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিলেও, এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি|
জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আদালত সূত্র ও বিচার বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশের অধস্তন আদালতগুলোর অনেক অবকাঠামো বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে| বহু ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, যা বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে| পর্যাপ্ত ভবনের অভাবে মামলার আলামত এবং বিচারিক নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা বিচার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে| সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এজলাস সংকট| এই সংকটের কারণে একাধিক বিচারককে একই এজলাস ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়| এর ফলে বিচারকদের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং মামলার শুনানির সময় কমে যাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে মামলার জট বাড়াতে ভূমিকা রাখছে| তা ছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট এবং অধস্তন আদালতগুলোতে তথ্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামোও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক করা সম্ভব হয়নি| এই সমস্ত সমস্যা সমাধানের জন্যই উন্নয়ন বাজেট ও প্রকল্প গ্রহণ অপরিহার্য ছিল|
বরাদ্দের প্রেক্ষাপট ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি বিচার বিভাগের এই সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গত ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়| ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘বিচার বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পনা কমিশনের অনুকূলে “বিশেষ প্রয়োজনে উন্নয়ন সহায়তা” খাতে জিওবি বাবদ সংরক্ষিত বরাদ্দ হতে সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়ে অর্থ বিভাগের নীতিগত সম্মতি নির্দেশক্রমে জানানো হলো|’ তবে এই বরাদ্দের সাথে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়| চিঠিতে বলা হয়, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত “সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা-২০২২” এবং বিদ্যমান আর্থিক বিধি-বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে| এই শর্তটিই মূলত সুপ্রিম কোর্টের জন্য এই অর্থ খরচের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে|
পরিপত্রের বৈষম্য ও সুপ্রিম কোর্টের চিঠির বিষয়বস্তু ২০২২ সালে পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক জারীকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির কোনো ক্ষমতা রাখা হয়নি| এই পরিপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের আওতায় গৃহীত বা বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ক্ষেত্রে যথাক্রমে স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ডিপিইসি বা ডিএসপিইসির সুপারিশক্রমে অনুরূপ প্রস্তাব অনুমোদন করবেন| এই তালিকায় রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের অন্যতম প্রধান—বিচার বিভাগের প্রধানের (প্রধান বিচারপতি) নাম নেই| এ ছাড়া, প্রকল্প যাচাই কমিটি, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি), বিভাগীয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (ডিপিইসি), বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (এসপিইসি) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি)—এ ধরনের কোনো কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি|
এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কোনো কর্মকর্তা প্রকল্প অনুমোদন কমিটির বৈঠকে থাকতে পারছেন না এবং নিজেরাও প্রকল্প অনুমোদন করার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না| অথচ সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও দুদকের মতো সাংবিধানিক বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে| এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন গত ১৭ আগস্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি চিঠি পাঠায়| ওই চিঠিতে অনূর্ধ্ব ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধান বিচারপতিকে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়| চিঠিতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিয়ে দ্রুত একটি পরিপত্র জারিরও আহ্বান জানানো হয়েছিল, যাতে বিচার বিভাগের উন্নয়নে বরাদ্দকৃত অর্থ কাজে লাগানো যায়|
অ্যাটর্নি জেনারেল ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতামত এই বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের একটির প্রধান| তাঁর অবশ্যই আর্থিক সক্ষমতা থাকা উচিত| একটি বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের ক্ষমতা বিচার বিভাগের প্রধানের না থাকাটা দুঃখজনক| রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জটিলতা থাকলে তা দ্রুত নিরসনের জন্য সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে বিচার বিভাগের উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়|
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন এই পরিস্থিতিকে ‘মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছেন| তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাজেট প্রণয়ন ও প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের না থাকাটা গ্রহণযোগ্য নয়| প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর এই বিষয়ে আনলিমিটেড ক্ষমতা থাকা উচিত; যাতে তিনি প্রয়োজন অনুপাতে প্রকল্প নিতে পারেন| সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এই অর্থ খরচের জন্য প্রয়োজনীয় বিধি তৈরি করতে পারেন বলে তিনি মনে করেন| তিনি আরও বলেন, সংসদ সচিবালয় বা নির্বাচন কমিশনকে এই ক্ষমতা দেওয়া হলে সুপ্রিম কোর্টকে কেন দেওয়া হবে না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে|
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার এই বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি চিঠি পেয়েছি| সুপ্রিম কোর্টের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে আমরাও চাই| কেননা সুপ্রিম কোর্টে পৃথক সচিবালয় না থাকায় তারা কোনো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারছে না| আমরা এই বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি দিয়েছি| আইন মন্ত্রণালয় পজিটিভ মতামত দিলে আমরা পরিপত্র সংশোধন করে দেব| এর মধ্যে না হলে আগামী মাসে ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের সভা আছে| সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব|’ সচিব আরও আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আশা করছি, বিষয়টি এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে|’
আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের ওপর নির্ভর করে পরিপত্র সংশোধন করা হবে, তা নিশ্চিত করেছেন পরিকল্পনাসচিব| তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সুপ্রিম কোর্টের বরাদ্দকৃত অর্থ খরচের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি একটি জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই| ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের সভা পর্যন্ত এই অর্থ খরচের সিদ্ধান্তটি আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে|
উপসংহার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আধুনিকায়নের জন্য আর্থিক স্বায়ত্তশাসন অত্যন্ত জরুরি| সরকার সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়নের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে একটি ভালো নজির স্থাপন করেছে, কিন্তু সেই অর্থ খরচের ক্ষমতা প্রশাসনিক পরিপত্রের মাধ্যমে আটকে রাখাটা বৈষম্যমূলক এবং বিচার বিভাগের উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দিচ্ছে| সংসদ সচিবালয়, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও দুদক—এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা পায়, তবে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের অন্যতম প্রধান বিচার বিভাগের প্রধানকে এই ক্ষমতা দেওয়াটা সময়ের দাবি| পরিপত্র সংশোধন করে প্রধান বিচারপতিকে উপযুক্ত ক্ষমতা প্রদান করা হলে তা কেবল বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নই নিশ্চিত করবে না, বরং বিচারকদের মনোবল বাড়াবে এবং সার্বিকভাবে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category