সারাদেশে হামের টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকলেও এই রোগে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসা সেবার চরম ঘাটতির কারণে রোগীরা বড় শহরমুখী হচ্ছেন, যার ফলে রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড় এবং আইসিইউ সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতোমধ্যে বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে।
আপনার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাম পরিস্থিতির বর্তমান চালচিত্র নিচে গুছিয়ে উপস্থাপন করা হলো:
প্রান্তিক সেবার ঘাটতি ও হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়
গ্রাম ও প্রান্তিক পর্যায়ে হামের সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগীরা দলে দলে ঢাকায় আসছেন। এতে হাসপাতালগুলো হাম আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সংকট সামাল দিতে পর্যাপ্ত আইসিইউ বেড বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।
টিকার হার ৬১%, তবু কমছে না মৃত্যু
সংক্রমণ রুখতে সরকার দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বুধবার পর্যন্ত এক কোটি দশ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা মোট লক্ষ্যের প্রায় ৬১ শতাংশ। এরপরও সংক্রমণ বা মৃত্যু কোনোটাই উল্লেখযোগ্য হারে কমছে না।
এর পেছনের মূল কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ ‘অব্যবস্থাপনা’-কে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “যদি ভালোভাবে রোগীদের ম্যানেজ করা যেত এবং ঠিকমতো আইসোলেশন করা যেত, তবে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই কমানো সম্ভব হতো।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, টিকা দেওয়ার সাথে সাথেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না; শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তাই শুধু টিকা দিলেই রাতারাতি সংক্রমণ কমবে না।
মে মাসে সংক্রমণ কমলেও মৃত্যু বাড়ার শঙ্কা
আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ হয়তো কমবে, কিন্তু মৃত্যুহার বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হামের সংক্রমণ কমে যাওয়ার আশা করছি। কিন্তু মৃত্যু কমতে আরও এক মাস বেশি সময় লাগবে। কারণ ইতোমধ্যেই যারা সংক্রমিত হয়েছেন এবং যাদের পুষ্টিহীনতা বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা রয়েছে, তারা ধীরে ধীরে গুরুতর পর্যায়ে চলে যাবেন। ফলে মৃত্যু এখন বাড়তির দিকেই থাকবে।”
জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করা ও সরকারের অবস্থান
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার পরামর্শ দিলেও সরকার এখনো সে পথে হাঁটেনি। স্বাস্থ্য বিভাগ মূলত রোগীর চাপ সামলানোর চেয়ে সংক্রমণ কমানোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান বর্তমান আইসিইউ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “রোগীর সংখ্যা বাড়লে ক্রাইসিস হবে, এটাই স্বাভাবিক। এটা লুকানোর কিছু নেই। খারাপ অবস্থা নিয়ে যত রোগী আসবে সবাইকে আমরা আইসিইউ বেড দিতে পারব না। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হামের রোগীর সংখ্যা কমিয়ে ফেলা।”
সরকারের আশা, আগামী ৮ থেকে ১৫ই মে’র মধ্যে টিকাদান কর্মসূচির সুফল মিলতে শুরু করবে এবং সংক্রমণ কমে এলে হাসপাতাল ও আইসিইউর ওপর চাপ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।