• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ অপরাহ্ন
Headline

বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে নোম্যান্স ল্যান্ডে নেই সেই ২৮ জন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে পুশইনের জেরে সৃষ্ট চরম উত্তেজনা ও মানবিক সংকটের পর এক রহস্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের চেষ্টা এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর প্রতিরোধের মুখে দুই দিন ধরে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকে পড়া ২৮ জন মানুষকে আর সেখানে দেখা যাচ্ছে না। গত দুই দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটানোর পর শনিবার ভোর থেকে তাঁরা হঠাৎ করেই সীমান্ত এলাকা থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছেন। তবে সীমান্ত রেখার ওই নির্দিষ্ট স্থানে তাঁদের ব্যবহৃত পোশাক, ব্যাগ ও দৈনন্দিন জিনিসপত্র এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা সীমান্ত এলাকায় নতুন করে রহস্য ও চাঞ্চল্যের জন্ম দিয়েছে। বিএসএফের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বা তথ্য দেওয়া না হলেও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির জোরালো ধারণা, গভীর রাতের আঁধারে এবং কৌশলগত গোপনীয়তা অবলম্বন করে ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা গত রাতের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন। বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের আনারপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান জানান, শুক্রবার রাতের গভীরতার সাথে সাথে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশে এক অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। গভীর রাতে অন্তত তিনটি ভারতীয় গাড়ি বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখার খুব কাছাকাছি এসে অবস্থান নেয়। এর কিছুক্ষণ পরই কোনো ঘোষণা ছাড়াই ওপার থেকে বিএসএফ সদস্যরা দুই দফায় সীমান্তের শক্তিশালী সার্চলাইট ও ফ্ল্যাডলাইটগুলো সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলে এবং প্রতিটি দফায় প্রায় ১০ মিনিট করে পুরো সীমান্ত এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, এই পরিকল্পিত অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করা ওই ২৮ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে অন্তত ৫০ গজ ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শনিবার সকালে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসী শূন্যরেখায় গিয়ে দেখেন যে সেখানে কোনো মানুষ নেই। তবে তাড়াহুড়ো করে স্থান ত্যাগের কারণে তাঁদের পরনের কিছু কাপড় ও ব্যক্তিগত ব্যাগ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং তাঁদের ব্যবহৃত রান্নার হাঁড়ি-পাতিল ও কিছু শুকনো খাবার তালগাছের পাতা দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে।

এই রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনার পর বিজিবির ১৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম একটি আনুষ্ঠানিক প্রেস নোটের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে নো ম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের প্রায় ৫০ গজ অভ্যন্তরে ওই ২৮ জন নাগরিক গত দুই দিন ধরে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু শনিবার ভোররাত থেকে সেই নির্দিষ্ট স্থানে তাঁদের আর কোনো উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। বিজিবির গোয়েন্দা ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এটি প্রায় নিশ্চিত যে, রাতের কোনো এক সুবিধাজনক সময়ে বিএসএফ সদস্যরা তাঁদের জোরপূর্বক বা কৌশলে ভারতের মূল ভূখণ্ডের ভেতরের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। অধিনায়ক আরও জানান যে, এই ঘটনার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা বা নতুন করে পুশইনের চেষ্টা রুখতে ১৬ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন পুরো সীমান্ত এলাকায় বিজিবির পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং কঠোর টহল ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

ধরণের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে। বিজিবির রেকর্ডপত্র এবং সীমান্ত সূত্র অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তের ২০৩/৬-আর নম্বর মেইন পিলারের সংলগ্ন এলাকা দিয়ে ওই বিশাল দলটিকে জোরপূর্বক বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। ভারতের ১২ ব্যাটালিয়নের আশরাফপুর বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা এই পুশইনের সরাসরি নেতৃত্ব দেয়। এই দলটিতে মোট ২৮ জন মানুষ ছিলেন, যার মধ্যে ১২ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৬ জন অবুঝ শিশু ছিল। গভীর রাতে আকস্মিকভাবে এই পুশইনের চেষ্টা করা হলে সীমান্তে কর্তব্যরত বিজিবি জোয়ানরা অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে তা প্রতিরোধ করেন এবং দেশের sovereignty বা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অনড় অবস্থান নেন। বিজিবির এই অতন্দ্র ও আপসহীন প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ তাঁদের বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয়। ফলে নিরুপায় হয়ে ওই নারী, পুরুষ ও শিশুরা বুধবার রাত থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় তথা নো ম্যান্স ল্যান্ডের ভারতীয় অংশের সীমানায় আটকা পড়েন।

দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর অনড় অবস্থানের কারণে এই ২৮ জন মানুষের জীবন চরম মানবিক ঝুঁকিতে পড়েছিল। প্রচণ্ড গরম, মশার উপদ্রব এবং ঝড়-বৃষ্টির আশঙ্কার মধ্যেও খোলা আকাশের নিচে খোলা মাঠে তাঁদের দিন কাটাতে হয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতে, বিএসএফের এই ধরনের পুশইনের চেষ্টা এবং পরবর্তীতে রাতের আঁধারে আলো নিভিয়ে গোপনে মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির চরম লঙ্ঘন। শিশুদের নিয়ে নারীদের এভাবে সীমান্তে ফেলে রাখা এবং পরবর্তীতে রাতের অন্ধকারে প্রমাণ লোপাটের মতো আচরণ অত্যন্ত অমানবিক। বর্তমানে বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে বিজিবির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি রাখা হয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষীরা সদা প্রস্তুত রয়েছে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category