• সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন
Headline
জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সার্থক হয়েছে : হুমায়ুন ক‌বির দুদকের প্রেস ব্রিফিং চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আসিফ মাহমুদের রিট ১৮ দেশের বাজারকেন্দ্রিক রপ্তানি কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার : বাণিজ্য সচিব চুয়াডাঙ্গায় ভারতীয় মাদক ও প্রসাধনসামগ্রী উদ্ধার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়ন করে প্রতিবেদন তৈরির সুপারিশ স্থায়ী কমিটির গুণী শিক্ষক সম্মাননা ১০০ জনে উন্নীত করা হচ্ছে: মাহ্দী আমিন আমিষের ঘাটতি পূরণে দেশের মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য চাষ গুরুত্বপূর্ণ : স্পিকার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান পুনর্ব্যক্ত আইরিন খানের দেশে কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প উদ্বোধনের ভেন্যু পরিদর্শনে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

বাফার জোনে অবরুদ্ধ হাজারো জীবন: ভারতের সীমান্ত গ্রামগুলো যেন উন্মুক্ত কারাগার

Reporter Name / ১ Time View
Update : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী একটি অখ্যাত গ্রাম হাকিমপুর। এই গ্রামের একটি ধুলোমাখা সড়কের ওপর স্থাপন করা হয়েছে একটি অস্থায়ী চেকপয়েন্ট বা তল্লাশিচৌকি। আর এই একটি মাত্র চেকপয়েন্টেই থমকে যাচ্ছে শত শত মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সাধারণ ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা এবং সীমান্তের প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার। সেখানে অপেক্ষমাণ বোরকা পরিহিতা দুই তরুণীর দৃশ্যটি যেন এই অঞ্চলের নিত্যদিনের এক করুণ প্রতিচ্ছবি। একজন ভারতীয় সীমান্তরক্ষী অত্যন্ত সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাদের পিঠ থেকে নামানো ব্যাগগুলো তন্নতন্ন করে তল্লাশি করছেন। এই তল্লাশির মধ্যে কেবল নিরাপত্তার অজুহাতই নেই, বরং রয়েছে এক ধরনের অবমাননাকর মানসিকতা। এই চেকপয়েন্টের ঠিক পেছনেই রয়েছে প্রায় এক কিলোমিটার চওড়া একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর বাফার জোন। ভৌগোলিক ও আইনিভাবে এই অঞ্চলটি পুরোপুরি ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থিত হলেও, এখানকার বাসিন্দাদের জীবনে দেশের অন্য সাধারণ নাগরিকদের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার কোনো অধিকার বা স্বাধীনতা নেই। বিশ্বের অন্যান্য অনেক বিতর্কিত সীমান্ত এলাকার মতো এটি কোনো ‘নো-ম্যানস-ল্যান্ড’ বা মালিকানাবিহীন ভূমি নয়, এটি ভারতের নিজস্ব ভূখণ্ড। অথচ এই বাফার জোনের ভেতরে থাকা সাতটি গ্রামের প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষ প্রতিদিন নিজেদের দেশেই এক ধরনের বন্দিজীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিনিধিরা যখন সীমান্তের এই ক্রমশ বাড়তে থাকা কঠোর বিধিনিষেধ, অমানবিক তল্লাশি এবং সাধারণ মানুষের অবরুদ্ধ জীবনযাপন নিয়ে তথ্যানুসন্ধান করতে যান, তখন তাদের চারধারে অভিযোগ জানানোর জন্য স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষদের এক বিশাল ভিড় জমে যায়। এই মানুষগুলোর চোখেমুখে জমে থাকা ক্ষোভ আর হতাশা যেন এক নীরব আর্তনাদ। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, এই বিতর্কিত বাফার জোনটি মূলত তৈরি করা হয়েছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আসা তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ স্রোত ঠেকানোর একটি কঠোর কৌশল হিসেবে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণে এই তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, ক্রমবিকাশমান অর্থনীতি এবং স্পর্শকাতর জনমিতিক বা ডেমোগ্রাফিক ভারসাম্যের জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ও আক্রমণাত্মক ভাষায় এই মানুষদের ‘উইপোকা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, প্রতিটি তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে। তাঁর এই ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য সীমান্তবর্তী রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।

এটি অনস্বীকার্য যে, বিশাল আয়তনের দেশ ভারতে বর্তমানে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র বা আইনি নথিপত্র ছাড়াই বসবাসকারী বিদেশির সংখ্যা নেহাত কম নয়, এই সংখ্যাটি সম্ভবত কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটা ঠিক যে তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক মানুষ বাংলাদেশিও হতে পারে। কিন্তু ভারত সরকার অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে এই নথিপত্রহীন মানুষের সংখ্যা দুই কোটি পর্যন্ত হতে পারে বলে এক চাঞ্চল্যকর ও অতিরঞ্জিত হিসাব রাজনৈতিক মঞ্চে উল্লেখ করে থাকে। শুধু তাই নয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শপথ করে বলা হচ্ছে যে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে ভারত থেকে চিরতরে বের করে দেওয়া হবে। সম্প্রতিকালে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক কড়া নির্দেশনায় অমিত শাহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারত কোনো ‘ধর্মশালা’ বা দাতব্য অতিথিশালা নয় যে যে কেউ চাইলেই এখানে এসে বিনা বাধায় বসবাস করতে পারবে।

রাজনৈতিক এই চরম আক্রমণাত্মক বাগাড়ম্বরের দিক থেকে বিচার করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাগুলো হয়তো তাঁর দলের রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়, কিন্তু এর বাস্তব ফলাফল হয়েছে অত্যন্ত ভয়াবহ। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকাগুলো এখন আক্ষরিক অর্থেই খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত এক বিশাল ও অমানবিক কারাগারের রূপ ধারণ করেছে। পুরো সীমান্তজুড়ে মাইলের পর মাইল দুর্ভেদ্য কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। যেখানে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতার কারণে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়, সেখানে সীমান্ত পাহারার কাজে সাপ এবং কুমির ব্যবহারের মতো উদ্ভট ও অবাস্তব চিন্তাভাবনার কথাও ভারতের তরফ থেকে বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছিল। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মারণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত তিন ডজনেরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। সীমান্তে এই কঠোর নীতির কারণে যে কেবল বাংলাদেশিরাই প্রাণ হারাচ্ছেন বা নির্যাতিত হচ্ছেন তা নয়, বরং সীমান্তের এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও বিষাক্ত রাজনীতির ফাঁদে পড়ে খোদ ভারতীয় নাগরিকরাও প্রতিদিন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার প্রায় চার হাজার একশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তর্জাতিক সীমান্তটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ সীমান্তগুলোর একটি। একই সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম একটি অরক্ষিত ও জটিল সীমান্ত হিসেবেও পরিচিত। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলের দেশভাগের এক নির্মম ইতিহাস এই অঞ্চলের কয়েক কোটি ভাষাভাষী বাঙালিকে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা স্বাধীন দেশে বিভক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মানুষের হাজার বছরের নাড়ির টান আর সাংস্কৃতিক বন্ধন পুরোপুরি ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। তাই এখনো দুই পারের অনেক মানুষ নানা প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে কিংবা আত্মীয়স্বজনের টানে সীমান্তের এপার-ওপার যাতায়াত করেন। এই সীমান্তের ভৌগোলিক বুনন এতটাই অদ্ভুত যে, এখনো এমন অনেক বাড়ি রয়েছে যার রান্নার ঘর পড়েছে ভারতের সীমানায় আর শোবার ঘরটি রয়ে গেছে বাংলাদেশের সীমানায়। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা কতটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তার একটি চমৎকার উদাহরণ দেন স্থানীয় দোকানদার টনি সরদার। তিনি তাঁর স্মার্টফোনে ইকোনমিস্টের সাংবাদিকদের এমন একটি নৌকাবাইচের পুরোনো ভিডিও দেখান, যেখানে নদীর যে অংশটি অনায়াসেই সাঁতরে পার হওয়া যায়, ঠিক তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিরা উল্লাসের সঙ্গে ভারতীয় মাঝিদের উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দুই দেশের মানুষের মিলনের এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি চলতি বছরের বসন্তকাল থেকেই প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যখন জাতীয়ভাবে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করে, তখন থেকেই মূলত ভারতের সীমান্তনীতি ধীরে ধীরে আরও অনেক বেশি কঠোর, কট্টর ও অমানবিক হতে শুরু করে। কিন্তু এই বছর এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুনগুলো আরও বেশি আক্রমণাত্মক ও কদর্য রূপ ধারণ করে। ইকোনমিস্টের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রাজ্যে প্রথমবারের মতো অভাবনীয় বিজয় অর্জন করে বিজেপি যখন বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত আগস্ট মাসে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা জারি করে জানানো হয় যে, সীমান্তবর্তী প্রতিটি স্পর্শকাতর শহরে সম্পূর্ণ নতুন একটি করে অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ইউনিট বা ইন্টেলিজেন্স সেল মোতায়েন করা হবে। এই গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর প্রধান কাজই হবে সীমান্ত এলাকার উগ্রপন্থী গোষ্ঠী এবং চোরাকারবারিদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক ও তীক্ষ্ণ নজরদারি বজায় রাখা।

বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’দের জোরপূর্বক ‘পুশব্যাক’ বা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার নীতিটি নিয়ে অত্যন্ত ব্যাপক ও আগ্রাসী প্রচারণা চালিয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। যারা জন্মসূত্রে ভারতীয় হওয়া সত্ত্বেও কেবল ভাষাগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। ভারতের বিভিন্ন দূরবর্তী স্থান থেকে এই সন্দেহভাজন মানুষদের জোরপূর্বক আটক করে বাসে করে গাদাগাদি করে সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে নিয়ে আসা হয়। এরপর কোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়া, বিচারিক সুযোগ কিংবা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে কোনো প্রকার আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছাড়াই রাতের অন্ধকারে তাদের জোর করে বাংলাদেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়। এই সম্পূর্ণ বেআইনি ও তাৎক্ষণিকভাবে বানানো পদ্ধতিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম আইনি প্রক্রিয়া বা ‘ডিউ প্রসেস অফ ল’-কে চরমভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

এই অমানবিক পুশব্যাক নীতির কারণে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা হলেও, পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এসবে বিন্দুমাত্র দমে যাননি বা পিছু হটেননি। উল্টো তিনি রাজ্য পুলিশ প্রশাসনকে অত্যন্ত কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যেন আটককৃত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কোনো আইনি ঝামেলায় না গিয়ে সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নিঃশর্তভাবে তুলে দেওয়া হয়। গত জুনের শেষ নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে প্রকাশ্য জনসভায় ঘোষণা করেন যে, তাঁর আমলেই অন্তত দশ হাজার তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীকে পুশব্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। যদিও স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই পুশব্যাকের প্রকৃত সংখ্যা দশ হাজার না হলেও তা অন্তত পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজারের কাছাকাছি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারও নিজেদের সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) টহল ব্যাপকভাবে জোরদার করায়, ভারত থেকে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া এই মানুষদের অধিকাংশই এখন আটককেন্দ্র বা ওই দমবন্ধ করা বাফার জোনগুলোতে আটকা পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

মানবাধিকার কর্মীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, যাদের এই প্রক্রিয়ায় নির্বাসিত করা হচ্ছে, তাদের প্রায় সবাই ধর্ম পরিচয়ে মুসলিম। শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং মক্কার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ার মতো ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের কারণেই তাদের বিদেশি বলে সন্দেহ করে আটক করা হচ্ছে। তাদের অনেককেই মূলত ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার পর আটক করা হয়। এই প্রক্রিয়াটির নাম দেওয়া হয়েছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে বহু বৈধ বাসিন্দাকে ভোট দেওয়ার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে এক ধরনের আইনি সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। যদিও আটককৃতদের অনেকেই নিজেদের নাগরিকত্বের সপক্ষে আদালতে উপস্থাপন করার মতো বহু পুরোনো ও শক্ত নথিপত্র দেখাতে সক্ষম, তবুও তাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।

একই সময়ে স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দারা এক অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক দ্বৈত নীতির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, তারা অনেকবার দেখেছেন যে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বসবাসকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা যখন সীমান্তরক্ষীদের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন, তখন তাদের আটক না করে উল্টো আশ্বস্ত করা হয়। সেই সব হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা নিশ্চিন্তে ভারতেই থেকে যেতে পারবেন। এর পেছনে সরকারের যুক্তি হলো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হিন্দুরা কথিতভাবে ‘ক্রমবর্ধমান হামলার শিকার’ হচ্ছেন বা ধর্মীয় নিপীড়নের ভয়ে তারা দেশ ছেড়েছেন। ২০২৪ সাল থেকে ভারতের এই বৈষম্যমূলক দ্বৈত মানদণ্ডটি পুরোপুরি আইনে পরিণত হয়েছে। নতুন এই নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিম সংখ্যালঘুরা ভারতে আশ্রয়ের জন্য আইনি আবেদন করতে পারবেন এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।

এই সব নানামুখী চাপ, বৈষম্য এবং তল্লাশির কারণে সীমান্তের দৈনন্দিন জনজীবন এখন অত্যন্ত একঘেয়ে, চরম ক্লান্তিকর এবং প্রতিনিয়ত ভীতিজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায়ই চেকপয়েন্টগুলোতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে অকারণে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হয়। সীমান্তরক্ষীরা সাধারণ মানুষদের মোটরবাইকের প্রতিটি যন্ত্রাংশ খুলে খুলে পরীক্ষা করে এবং সন্দেহ হলে মানুষের নিয়ে যাওয়া সাধারণ খাবারের বাক্সের ভেতরে লাঠি বা আঙুল ঢুকিয়ে তল্লাশি চালায়, যা অত্যন্ত অমানবিক ও অপমানজনক। বিশেষ করে শীতের সকালে ঘন কুয়াশার মধ্যে কর্মকর্তারা সবসময় চেকপয়েন্টে দায়িত্ব পালনের মতো মেজাজে থাকেন না। ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষেরা নিজ দেশেই সীমান্তের এপার-ওপার আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হন। চোরাকারবারি চক্রকে ঠেকাতে গিয়ে সরকার যে নতুন রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, তার সরাসরি বলি হচ্ছেন ওই বাফার জোনের সাধারণ মানুষ। এই অদ্ভুত রেশনিংয়ের কারণে গ্রামবাসীদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার খাবার, শিশুদের অতি প্রয়োজনীয় ফর্মুলা দুধ এবং নারীদের স্যানিটারি প্যাডের মতো মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী থেকেও তাদের চরমভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সীমান্তবর্তী একটি গ্রামের প্রধান আকমল গাজী নিজের ক্ষোভ ও হতাশা আর ধরে রাখতে পারেননি। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা কি আসলেই ভারতের অংশ? নাকি আমরা কোনো অপরাধী?’

ভারতের অভ্যন্তরীণ এই মেরুকরণের রাজনীতি প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও অনেক বেশি তিক্ত ও জটিল করে তুলেছে। ভূরাজনৈতিক কারণে এই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এমনিতেই আগে থেকেই অত্যন্ত নড়বড়ে ও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, ভারতের উচিত তাদের পরীক্ষিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে অন্তত কিছুটা ‘ইজ্জত’ অর্থাৎ সম্মান দেখানো। কিন্তু ভারতীয় ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের মুখে ‘উইপোকা’ এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’র মতো অবমাননাকর শব্দের নিয়মিত ব্যবহার দেখে এটা অত্যন্ত স্পষ্টতই মনে হয় যে, তাদের রাজনৈতিক অভিধানে প্রতিবেশীর জন্য সম্মানের খুব বেশি জায়গা আদৌ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এই বিভাজনের রাজনীতি যত দিন চলবে, সীমান্তের প্রান্তিক মানুষের এই কান্না ও বন্দিদশা তত দিনই দীর্ঘায়িত হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category