ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক মিলের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যকার যাতায়াত সবসময়ই একটি স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। রাষ্ট্র পর্যায়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা কূটনৈতিক টানাপোড়েন মাঝে মাঝে সম্পর্কে শীতলতা আনলেও, দুই দেশের সাধারণ মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে তা খুব একটা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান যেন সেই বাস্তবতারই এক অকাট্য প্রমাণ। পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের পর্যটন খাতে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের ক্ষেত্রে রীতিমতো রাজত্ব করছে বাংলাদেশ। গত আগস্ট মাসে ভারতে বিদেশি পর্যটকদের আগমনে যে বিশাল উল্লম্ফন দেখা গেছে, তার মূল চালিকাশক্তিই ছিল লাল-সবুজের পাসপোর্টধারী বাংলাদেশের নাগরিকরা। দুই দেশের মধ্যে চলমান বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও বাংলাদেশিদের ভারতমুখী স্রোত শুধু অব্যাহতই থাকেনি, বরং তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যের বরাতে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের আগস্ট মাসে ভারতে বিদেশি পর্যটক আগমনের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ভারতের পর্যটন খাতের জন্য একটি বিশাল মাইলফলক, কারণ গত দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে কোনো একক মাসে পর্যটক আগমনের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আগস্ট মাসে মোট বিদেশি পর্যটক এসেছেন প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ৬ লাখ ২৫ হাজারের কিছু বেশি। পর্যটক আগমনের এই অভাবনীয় বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছে বাংলাদেশের নাগরিকরা।
পরিসংখ্যানের গভীরে গেলে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসেই বাংলাদেশ থেকে ৭৪ হাজারের বেশি পর্যটক ভারতে ভ্রমণ করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক ইস্যু, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং সরকার পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হলেও, সাধারণ মানুষের ভ্রমণের ক্ষেত্রে তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। বরং ভারতের পর্যটন অর্থনীতিকে চাঙা রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বড় এবং নির্ভরযোগ্য উৎস বাজার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে আসছে। ২০২৩ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতে বিদেশি পর্যটক পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরঙ্কুশভাবে শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণ করলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভারত ভ্রমণের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রধান কারণটি হলো চিকিৎসাসেবা বা মেডিক্যাল ট্যুরিজম। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রতি মাসে হাজার হাজার বাংলাদেশি রোগী ভারতের চেন্নাই, ভেলোর, কলকাতা, বেঙ্গালুরু এবং নয়াদিল্লির মতো শহরগুলোতে ছুটে যান। ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ (সিএমসি) ভেলোর, অ্যাপোলো হাসপাতাল, টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতালসহ ভারতের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর মোট আয়ের একটি বিশাল অংশ আসে এই বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকেই। তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার নিশ্চয়তাই মূলত বাংলাদেশিদের ভারতমুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
চিকিৎসার পাশাপাশি কেনাকাটা এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যও বাংলাদেশি পর্যটকদের ভারত গমনের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ঈদ, পূজা বা বিয়ের মতো বড় উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশিদের মধ্যে কলকাতা বা দিল্লিতে গিয়ে কেনাকাটা করার এক বিশাল প্রবণতা রয়েছে। কলকাতার নিউমার্কেট, গড়িয়াহাট, হাতিবাগান থেকে শুরু করে শপিং মলগুলো বাংলাদেশিদের কেনাকাটায় সবসময় সরগরম থাকে। এর বাইরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ জামাকাপড়, প্রসাধনী ও অন্যান্য পণ্য আমদানির উদ্দেশ্যে নিয়মিত ভারত যাতায়াত করেন। এই বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ক্রেতার ওপর নির্ভর করে কলকাতার স্থানীয় অর্থনীতি, বিশেষ করে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং খুচরা বিক্রেতারা ব্যাপকভাবে লাভবান হন।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিনোদন ও অবকাশ যাপনের জন্যও ভারত অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। সহজে যাতায়াত করা যায় বলে দার্জিলিং, মেঘালয়, সিকিম, কাশ্মীর, সিমলা কিংবা গোয়ার মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশিদের ভিড় বছরজুড়েই লেগেই থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে বা ঈদের ছুটিতে বেনাপোল-পেট্রাপোল কিংবা আখাউড়া-আগরতলা চেকপোস্টে পর্যটকদের যে দীর্ঘ সারি দেখা যায়, তা প্রমাণ করে ভ্রমণের গন্তব্য হিসেবে ভারতের প্রতি বাংলাদেশিদের কতটা আকর্ষণ রয়েছে। ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেস, খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস কিংবা ঢাকা-শিলিগুড়ি মিতালী এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনগুলো দুই দেশের মানুষের যাতায়াতকে আরও সহজ ও আরামদায়ক করেছে।
ভারতের পর্যটন খাতের ওপর বাংলাদেশের এই বিশাল প্রভাবের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যখন অন্যান্য দেশের পর্যটকদের পরিসংখ্যানের সঙ্গে এর তুলনা করা হয়। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাশাপাশি চীন থেকেও ভারতে পর্যটক আগমন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগস্ট মাসে চীন থেকে ভারতে আসা পর্যটকের সংখ্যা বার্ষিক হিসাবে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ৭৪ হাজারেরও বেশি, যা চীনের তুলনায় আট গুণেরও বেশি। এছাড়া আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে ভারতে পর্যটক আগমন প্রায় ৩ শতাংশ করে বেড়েছে। কানাডা, জার্মানি, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা থেকেও পর্যটক আগমন ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যান্য দেশের এই প্রবৃদ্ধির হারকে একসঙ্গে মেলালেও তা এককভাবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির কাছে নিতান্তই ম্লান হয়ে যায়। মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের এই বিশাল সংখ্যার অভাবেই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে ভারতের বিদেশি পর্যটক আগমনে কোনো দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি, যা আগস্ট মাসে এসে বাংলাদেশিদের হাত ধরেই অর্জিত হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এত বিপুল সংখ্যক পর্যটক যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি সবসময় মসৃণ নয়। ভারতের ভিসা প্রাপ্তি নিয়ে বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অভিযোগ ও ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক) ঢাকায় অবস্থিত হওয়ার পরও ভিসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, ই-টোকেন জটিলতা, রিজেকশন এবং সীমান্তে ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ লাইন ও হয়রানি বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এত সব বাধা, ভোগান্তি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক শীতলতার পরও যখন এক মাসে ৭৪ হাজার বাংলাদেশি ভারত ভ্রমণ করেন এবং ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটে, তখন এটি খুব সহজেই অনুমেয় যে যাতায়াত ব্যবস্থা ও ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ হলে এই সংখ্যাটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক সবসময় শুধু সরকারি চুক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ সেই সম্পর্ককে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটিই ঘটছে। বাংলাদেশিরা যেমন চিকিৎসার বা ভ্রমণের প্রয়োজনে ভারতে যাচ্ছেন, ঠিক তেমনি ভারতীয় পর্যটন খাত, পরিবহন খাত ও চিকিৎসা খাত এই বাংলাদেশিদের অর্থের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কলকাতার মারকুইস স্ট্রিট বা সদর স্ট্রিটের হোটেলগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় এগুলো যেন বাংলাদেশেরই কোনো অংশ। সেখানকার হোটেল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও অকপটে স্বীকার করেন যে বাংলাদেশি পর্যটক না থাকলে তাদের ব্যবসা পথে বসবে।
পরিশেষে বলা যায়, ভারতের পর্যটন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের এই একচেটিয়া রাজত্ব এবং অবদানকে ভারতের নীতিনির্ধারকদের আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ শুধু ভারতের প্রতিবেশীই নয়, বরং তাদের পর্যটন ও চিকিৎসা খাতের সবচেয়ে বড় ভোক্তা ও পৃষ্ঠপোষক। তাই রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে যে টানাপোড়েনই থাকুক না কেন, সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সম্মানজনক করতে ভারতের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। মানুষে মানুষে এই নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, স্থিতিশীল ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক নিশ্চিত করতে। আগস্ট মাসের এই রেকর্ড প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন এবং পারস্পরিক নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত সব ধরনের রাজনৈতিক ও কৃত্রিম বিভাজনকে ছাপিয়ে যায়।
তথ্যসূত্র: প্রথম কলকাতা