• বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
Headline
ফ্রান্সের নতুন কোচ জিদান দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্নিকাণ্ডে ৬ বাংলাদেশি নিহত কক্সবাজারে শিশুকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে যুবক গ্রেফতার মিরপুর কলেজের দেয়াল ধসে একজনের মৃত্যু, আহত অন্তত ৭ মিরসরাই শিল্পাঞ্চলে ৩০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে আগ্রহী তুরস্কের সানকো মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সক্রিয় সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর তদন্ত হওয়া দরকার: তথ্য উপদেষ্টা দেশীয় প্রযুক্তির ভেন্টিলেটর ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন মেশিন প্রস্তুতকারকদের সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই : মির্জা ফখরুল

ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ঢাকা দিল্লি ও বেইজিং

Reporter Name / ২৮ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার খবর প্রকাশের পর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চীনের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ২০টি জে-টেনসিই (J-10CE) যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা এবং বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বেইজিংয়ের সাথে সমঝোতার বিষয়টি ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এই বিষয়ে দিল্লির অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। ভারতের সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশের এই নতুন সামরিক ও কৌশলগত অগ্রগতির ওপর তারা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে নজর রাখছে। একই সাথে পরিস্থিতি অনুযায়ী ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের পুরনো ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

নয়া দিল্লিতে আয়োজিত সেই ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণদীর জায়সবাল চীনের প্রস্তাবিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ভারতের উন্নয়ন সহায়তা সবসময় দুই দেশের পারস্পরিক সম্মত একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় এবং এটি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়ে থাকে। তিস্তা নদী প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের আপত্তির বিষয়টি ইতিমধ্যে ঢাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বিবেচনায় রাখা হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে তিস্তাসহ ভারত থেকে প্রবাহিত অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর যৌথ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েকদিন পরেই দিল্লির পক্ষ থেকে এই কড়া মন্তব্য এলো। এর আগে গত ২৯ জুন চীন সফর শেষে এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের তীব্র পানির সংকট নিরসনে জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশের এই মহাপরিকল্পনায় বেইজিংয়ের পূর্ণ ও ধারাবাহিক সমর্থন বজায় থাকবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে কী ধরনের অর্থনৈতিক বা সামরিক সম্পর্ক রাখবে, তা সম্পূর্ণ ঢাকার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প, সামরিক কেনাকাটা বা আঞ্চলিক করিডর ভাবনায় চীনের উপস্থিতি দিল্লিকে সবসময়ই চরম অস্বস্তিতে ফেলে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসন আমলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত-ঘেঁষা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই সময়ে ভারতের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে বা দিল্লির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত ঢাকা সাধারণত গ্রহণ করেনি। এমনকি তিস্তা চুক্তি ঝুলে থাকা সত্ত্বেও যেকোনো ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ভারতের মতামতকে এক ধরণের প্রাধান্য দেওয়া হতো। তবে পটপরিবর্তনের পর বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের নতুন পররাষ্ট্রনীতি হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই নীতিই মূলত ভারতের জন্য এক নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান ঢাকা প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আগের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বা কৌশলগত সিদ্ধান্তে বাইরের কোনো দেশের একচেটিয়া প্রভাব খাটানোর সুযোগ আর নেই।

ভূরাজনীতির এই জটিল সমীকরণে বাংলাদেশের জন্য ভারত যেমন একটি বড় প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, ঠিক তেমনি চীনও দেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বৃহৎ সেতু, শিল্পাঞ্চল এবং বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীনের বিপুল অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দৃশ্যমান হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের একটা বড় এবং নির্ভরযোগ্য অংশ দীর্ঘদিন ধরেই চীন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। নৌযান, সাবমেরিন, মিসাইল ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন—সবকিছুতেই চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। ঢাকার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মূলত একটি বাস্তববাদী ও সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষা নীতি। কিন্তু ভারতের উদ্বেগের মূল কারণ কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান পদচারণা। ভারত দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলকে তার নিজস্ব কৌশলগত প্রভাব বলয় হিসেবে বিবেচনা করে আসলেও গত দুই দশকে চীন অত্যন্ত কৌশলে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বহুগুণ বাড়িয়েছে। দিল্লির আশঙ্কা, প্রতিবেশীদের ওপর চীনের এই প্রভাব ভারতের আঞ্চলিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বিশেষ করে, সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে তিস্তা নদীর মতো একটি সংবেদনশীল আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনা ও বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে যদি চীনের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হতে পারে। একই সাথে আঞ্চলিক যোগাযোগ বা করিডর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ভারত সবসময় নিজের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ধরে রাখতে চায়। ফলে বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা কোনো চীনা করিডরে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণকে দিল্লি শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির অংশ হিসেবে দেখে না, বরং একে পুরোপুরি ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করে। এই ত্রিমুখী টানাপড়েনের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো একটি সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী ভারসাম্য রক্ষা করা। কোনো একটি পরাশক্তির পক্ষে সরাসরি অবস্থান না নিয়ে উভয়ের সঙ্গেই কার্যকর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার এই নীতিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ‘হেজিং কৌশল’ বলা হয়ে থাকে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন ঢাকার মূল পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category