ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ব ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং লোহিত সাগর থেকে হরমুজ প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই সংকটের ঢেউ সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই এমন এক আঞ্চলিক অস্থিরতার মুখে পড়ায় এখন কৌশলী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা।
*জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন*
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের প্রধান লাইফ লাইন। এটি বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়বে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর। যদিও সরকার আপাতত তেলের মজুত নিয়ে আশ্বস্ত করছে, তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা এবং তা সাশ্রয়ী করার চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
*ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি*
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, অন্যদিকে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে উন্নয়ন ও জনশক্তি রপ্তানির বিশাল সম্পর্ক—এই দুই মেরুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো পরাশক্তির সামরিক ঘাঁটি বা নিরাপত্তাজনিত চুক্তির প্রলোভনে পড়ে যেন জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন না দেওয়া হয়। অনেক দেশ মার্কিন প্রভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যেকোনো সামরিক বা কূটনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নীতিনির্ধারকরা।
*অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ*
রেমিট্যান্স ও জনশক্তি: মধ্যপ্রাচ্য আমাদের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান বাজার। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও নতুন কর্মী নিয়োগে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে।
তৈরি পোশাক শিল্প: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের পোশাক খাতের প্রধান ক্রেতা। যুদ্ধের কারণে বিশ্বমন্দা দেখা দিলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের রপ্তানি আয়।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য: লোহিত সাগর বা সুয়েজ খালের পথ অনিরাপদ হয়ে ওঠায় পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় দুই-ই বাড়বে।
*জাতীয় ঐকমত্য ও সতর্কতার তাগিদ*
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বৈশ্বিক সংকটের সময় কোনো এক পক্ষে হেলে পড়া ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বের প্রশ্নে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সাধারণ অবস্থানে আসা জরুরি।
জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংসদে আলোচনা এবং জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, সাময়িক রাজনৈতিক স্বার্থে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি গ্রহণ করা হবে না। দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতাই হবে এই সংকট উত্তরণের প্রধান অস্ত্র।