• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন
Headline
২০৩০ সালের মধ্যে ১০৬.৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য সরকারের নিখোঁজ শিশুর লাশ মিলল সীমান্তের ওপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন, তালিকায় যারা জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান জাতিসংঘে নতুন সরকারের বার্তা দেবেন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী কাল নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন সরকার স্টার্টআপ, উদ্যোক্তা তৈরি ও উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে : জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বাংলাদেশ সফরে আগ্রহী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা: রাষ্ট্রদূত মাকসুদ কামাল-জাফর ইকবালসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ, ফুলেফেঁপে উঠছে পুঁজিপতিরা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারের থলে হাতে যখন আপনি কাঁচাবাজারে যান, তখন কি একবারও আপনার মনে হয় যে আপনার পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া অতিরিক্ত টাকাগুলোর গন্তব্য কোথায়। কিংবা ধরুন, প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে অফিসে যাওয়ার জন্য যখন রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন এবং চালক আপনার কাছে আগের চেয়ে বেশ কিছুটা বাড়তি ভাড়া দাবি করে বসেন, তখন কি আপনার মাথায় এই হিসাবটি আসে যে এই বাড়তি ভাড়ার সঙ্গে সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক রণাঙ্গনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ঢাকা বা চট্টগ্রামের কোনো একটি সাধারণ রাস্তার যানজটের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন মনে হলেও, অর্থনীতির অদৃশ্য সুতোয় এই দুটি বিষয় অত্যন্ত শক্তভাবে গাঁথা রয়েছে। বিশ্বায়নের এই যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি শুধু সংবাদমাধ্যমের একটি শিরোনাম নয়, বরং এটি আপনার আমার প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি রূঢ় বাস্তবতা। আপনার পকেট থেকে নীরবে বেরিয়ে যাওয়া প্রতিটি বাড়তি টাকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিন শেষে চলে যাচ্ছে এমন সব রাঘববোয়ালদের পকেটে, যাদের সঙ্গে আপনার কোনো দিন দেখাও হবে না।

সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল নব্বই ডলারের নিচে। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে এই দাম প্রায় বিশ থেকে বাইশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক শ আট থেকে এক শ নয় ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে এক শ পনেরো টাকায়, পেট্রোল এক শ চল্লিশ টাকায় এবং অকটেনের দাম নির্ধারিত রয়েছে এক শ পঁয়তাল্লিশ টাকায়। যদিও সরকার এখনো স্থানীয় বাজারে তেলের দাম নতুন করে বাড়ায়নি, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এই প্রবল ঊর্ধ্বগতি কতদিন পর্যন্ত দেশের ভেতরে আটকে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র শঙ্কা বিরাজ করছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার পেছনের সবচেয়ে বড় কারণটি হলো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা।

বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত পানিপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাপে-নেউলে সম্পর্ক ও অব্যাহত সামরিক উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরে চলমান একের পর এক হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আতঙ্ক মানেই হলো খরচের এক বিশাল উল্লম্ফন। জাহাজ চলাচলের পথ যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই পণ্যবাহী জাহাজগুলোর বীমা বা ইনস্যুরেন্স খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের জীবনের ও সম্পদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি মাশুল বা চার্জ আরোপ করে। এই সমস্ত বাড়তি খরচের প্রতিটি পয়সা শেষ পর্যন্ত যুক্ত হয় প্রতি ব্যারেল তেলের মূল দামের সঙ্গে, যা বিশ্ববাজারকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করে তোলে।

এখন সবচেয়ে বড় এবং কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন হলো, তেলের দাম বাড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে যে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের লেনদেন হচ্ছে, সেই টাকাগুলো আসলে যাচ্ছে কোথায়। এর উত্তর খুঁজতে গেলে বৈশ্বিক পুঁজিবাদের এক নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে। এই বাড়তি অর্থের প্রথম ও সবচেয়ে বড় অংশটি সরাসরি চলে যায় তেল উত্তোলন ও রপ্তানিকারী দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এরপর সেই লাভের একটি মোটা অঙ্ক ঢোকে বহুজাতিক বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে, যারা সংকটকে পুঁজি করে নিজেদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও বীমা কোম্পানিগুলোও এই সংকটের সুযোগে তাদের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়। এরপর এই টাকার একটি অংশ আসে দেশীয় বড় বড় আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ অর্থের হাতবদল ঘটে, তার সম্পূর্ণ জোগানদাতা হলেন আপনি, আমি এবং বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ ভোক্তা।

অর্থনীতির ভাষায় এই প্রক্রিয়াটিকে একটি ভয়ংকর চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল বিক্রিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। বিষয়টি একটি সাধারণ উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরুন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম আট থেকে দশ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এখন একজন সাধারণ বাস বা ট্রাকচালক, যিনি প্রতিদিন গড়ে বেশ কয়েক লিটার জ্বালানি পুড়িয়ে গাড়ি চালান, তার দৈনন্দিন খরচ হয়তো মুহূর্তের মধ্যে তিন থেকে চার শ টাকা বেড়ে যাবে। এই বাড়তি খরচ কি সেই গাড়িচালক নিজের পকেট থেকে মেটাবেন। উত্তর হলো, কখনোই না। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীদের বাসভাড়া কিংবা পণ্য পরিবহনের ট্রাকভাড়া বাড়িয়ে দেবেন। সিএনজি অটোরিকশার চালকও ঠিক একই অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু করবেন। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ওপর। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যে সবজি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ট্রাকে করে শহরের আড়তে আসে, পরিবহন ভাড়ার অজুহাতে সেই প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিপ্রতি কয়েক টাকা করে বেড়ে যাবে। ফলে আপনি যখন বাজারে যাবেন, তখন আপনাকে সেই বাড়তি দামই পরিশোধ করতে হবে।

তবে তেলের দাম বাড়ার এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল পরিবহন খাত বা কাঁচাবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের ভেতরে অবস্থিত প্রতিটি কলকারখানার উৎপাদন খরচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত জেনারেটর থেকে শুরু করে ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়, তার ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খান কারখানার মালিকরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানিকারকরা অন্যান্য দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে টিকতে পারেন না, ফলে দেশের রপ্তানি আয় মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, বাড়তি দামে তেল আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। রিজার্ভ কমে গেলে দেশীয় মুদ্রা টাকার মান ডলারের বিপরীতে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর টাকার মান যখনই কমে যায়, তখন বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রতিটি জিনিসের দাম দেশের বাজারে পুনরায় বেড়ে যায়। এভাবেই তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে একটি ভয়ংকর দুষ্টচক্র বা ভিসিয়াস সার্কেল তৈরি হয়, যেখান থেকে সাধারণ মানুষের বের হওয়ার কোনো উপায় থাকে না।

এই পুরো সমীকরণে লাভ ও ক্ষতির হিসাবটি অত্যন্ত নির্মম ও একপাক্ষিক। সংকটের এই সময়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো, আন্তর্জাতিক বাজারে আধিপত্য বিস্তারকারী বড় বড় অয়েল জায়ান্ট, বিশাল শিপিং করপোরেশন এবং বীমা কোম্পানিগুলো। যুদ্ধ ও সংঘাত তাদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই আশীর্বাদ হয়ে আসে। অন্যদিকে, এই সংকটের চরম মূল্য চোকাতে হয় সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে। প্রতিদিন গাদাগাদি করে বাসে যাতায়াত করা সাধারণ যাত্রী, প্রখর রোদে প্যাডেল মারা রিকশাচালক, সিএনজিচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারখানার সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক পর্যন্ত সবাই এই ক্ষতির শিকার হন। আর এই ক্ষতির চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় সেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোক্তাকে, যার আয়ের খাতাটি নির্দিষ্ট, কিন্তু ব্যয়ের খাতাটি তেলের দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিদিন বড় হচ্ছে।

আমরা যদি ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের দিকে ফিরে তাকাই, তবে বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও কিছুটা স্পষ্ট হবে। সে সময়ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বেড়েছিল। সরকার প্রথমে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, রিজার্ভের ওপর চাপ সামলাতে না পেরে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছিল। এতে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি জটিল ও ভীতিকর। এবারের সংকটটি শুধু দাম বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বিরাট অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। যদি কোনো কারণে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে শুধু বেশি দাম দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনা সম্ভব হবে না। তখন দেশে ভয়াবহ জ্বালানি শূন্যতা তৈরি হতে পারে, যা গোটা দেশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীলতা ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। তেলের দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতিতে যে তীব্র হাহাকার তৈরি হয়, তার পেছনে আমাদের নিজস্ব জ্বালানি ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতাও সমানভাবে দায়ী। গত কয়েক দশক ধরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে, কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে যে ধীরগতি ও অবহেলা পরিলক্ষিত হয়েছে, তা রীতিমতো হতাশাজনক। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত গ্যাস ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারার কারণেই আজ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেই আমাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হয়। নিজস্ব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার না করে আমদানিনির্ভর জ্বালানিনীতি গ্রহণ করার ফলেই আমরা আজ এতটা অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থায় পতিত হয়েছি।

এই গভীর ও বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের পথটি মোটেও সহজ নয়, তবে অসম্ভবও নয়। জ্বালানি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিতিশীলতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হলে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানি নীতির দিকে হাঁটতে হবে। প্রথমত, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস ও কয়লা অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা রিনিউয়েবল এনার্জি, যেমন সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার ঘটাতে হবে, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমে আসে। তৃতীয়ত, দেশে এমন একটি শক্তিশালী ও গণমুখী গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমে এবং জ্বালানির সাশ্রয় হয়। সর্বোপরি, রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারে সর্বোচ্চ দক্ষতা ও সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অপচয় রোধ করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব।

পরিশেষে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার এই পুরো গল্পটি বারবার ঘুরেফিরে আপনার আমার পকেটেই এসে শেষ হয়। পৃথিবীতে যখনই তেলের দাম বাড়ে, তখন কিছু মানুষ রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়, আর কিছু মানুষ তাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবারটুকু বাদ দিতে বাধ্য হয়। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো এক বিলাসবহুল প্রাসাদে বসে কোনো এক ধনকুবের যখন তার মুনাফার হিসাব কষেন, ঠিক তখনই হয়তো ঢাকার রাস্তায় একজন সাধারণ চাকরিজীবী রিকশাভাড়া বাঁচাতে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। এই বাড়তি টাকাটা মূলত গরিবের পকেট কেটে ধনীর পকেটে স্থানান্তরিত হওয়ার একটি অত্যন্ত সুকৌশলী ও বৈশ্বিক প্রক্রিয়া মাত্র। আপনি প্রতিনিয়ত আপনার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন, আর সেই অর্থের পাহাড় গড়ে তুলছে অন্য কোনো গোষ্ঠী। তাই ভবিষ্যতে যখনই সংবাদমাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কোনো খবর শুনবেন, তখন শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেবেন না। বরং গভীরভাবে চিন্তা করে দেখবেন, এই অদৃশ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে আপনার পকেট থেকে কত টাকা প্রতিদিন লুট হয়ে যাচ্ছে এবং আপনার জীবনযাত্রার মানকে তা কীভাবে প্রতিনিয়ত নিচের দিকে নামিয়ে দিচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম তাই কেবল অর্থনীতিবিদদের জন্য কোনো সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, এটি আপনার আমার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রতিদিনের এক রূঢ় ও নির্মম বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category