বর্তমান সরকারের পথচলার মাত্র অর্ধবছরের মাথায় মন্ত্রিসভার কলেবর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বাহান্ন সদস্যে উন্নীত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বঙ্গভবনে নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে চারজন নতুন মন্ত্রী এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তিত হওয়ার পর এটি তৃতীয় বৃহত্তম মন্ত্রিসভা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকার যখন প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল, তখন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা মিলিয়ে প্রাথমিক আকার ছিল পঞ্চাশ জনের কাছাকাছি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বিভিন্ন শূন্য পদ পূরণ এবং নতুন দায়িত্ব বণ্টনের মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনা দলের এই বড় পরিসর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসের এই পুরো কার্যকালে মন্ত্রিসভায় মোট ছাপ্পান্ন জন ব্যক্তি কোনো না কোনো সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পাশাপাশি বর্তমান সরকারের অধীনে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রী ও বিশেষ উপদেষ্টার সংখ্যা বর্তমানে বারোতে এসে দাঁড়িয়েছে, যা অতীতে বাংলাদেশের অন্য কোনো সরকারে দেখা যায়নি। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই বড় আকারের মন্ত্রিসভা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন যে বিএনপি অতীতে নির্বাচনের প্রাক্কালে ছোট ও অত্যন্ত কার্যকর সরকার গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বর্তমান এই বর্ধিত রূপ তার সঙ্গে খানিকটা সাংঘর্ষিক। অতীতেও দেখা গেছে যে মন্ত্রিসভার আকার যত বেশি বড় হয়েছে, দাপ্তরিক সমন্বয় এবং সামগ্রিক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলার মাত্রাও তত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
মন্ত্রিসভায় নতুন যুক্ত হওয়া চার মন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল মঈন খান, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাচিং প্রু জেরী এবং বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। অন্যদিকে নতুন দুই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন হুমায়ুন কবির এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এর মধ্যে রশিদুজ্জামান মিল্লাতকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এই মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ফাঁকা হওয়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পেয়েছেন আব্দুল মঈন খান। এছাড়া বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। বিজেপি প্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে।
পূর্বে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সফল দায়িত্ব পালন করা রশিদুজ্জামান মিল্লাত পদোন্নতি পেয়ে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেছেন। একইভাবে সরকারের পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং বিমান চলাচল বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হুমায়ুন কবির এবার প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে সরাসরি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এছাড়া শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, যেখানে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের শুরুর দিকের বিভিন্ন শূন্যতা পূরণ এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্যই এই আকস্মিক রদবদল ও নতুন মুখ অন্তর্ভুক্তি অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সংসদীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে বড় আকারের মন্ত্রিসভা গঠনের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। অতীতে ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদের খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন মোট ষাটজন এবং শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলে সর্বমোট একষট্টি জন সদস্য দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে গঠিত সরকারগুলোতে উপদেষ্টার আধিক্যও লক্ষণীয় ছিল। বর্তমান সরকার প্রধান তারেক রহমানের এই বাহান্ন সদস্যের মূল মন্ত্রিসভা এবং বারোজন উপদেষ্টার বিশাল বহর নিয়ে দেশ পরিচালনার এই নতুন পথচলা শেষ পর্যন্ত কতটা সুফল বয়ে আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।