রাজধানীর বুকে জাতীয় সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত অত্যন্ত সুরক্ষিত আবাসিক এলাকা ন্যাম ভবনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর চাঞ্চল্য এবং রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে| সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যের অন্ধকার ও বিষাদময় দিকগুলো একে একে জনসমক্ষে আসতে শুরু করেছে| গত রোববার সন্ধ্যায় ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তরুণী মরিয়মের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ| চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ঘটনার সময় ওই ফ্ল্যাটেরই অন্য একটি কক্ষে এমপি নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম অবস্থান করছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে| এই আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় সরাসরি আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ| মেয়ের অকাল মৃত্যুর ন্যায়বিচার চেয়ে তিনি শেরেবাংলা নগর থানায় একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে পুলিশ এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে|
সোমবার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে মেয়ের নিথর দেহ নিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ| তার গগনবিদারী আহাজারি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কান্নায় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়| তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ, আক্ষেপ ও বেদনার সঙ্গে অভিযোগ করেন যে, বিয়ের পর থেকেই তার মেয়ের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন এমপি নজরুল এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা| মরিয়ম একাধিকবার ফোনে তার বাবাকে এই পারিবারিক নিগ্রহ ও অবহেলার কথা জানিয়েছিলেন এবং সেই অসহনীয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পাহাড়সম চাপেই তিনি আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে মাসুম বিল্লাহর দৃঢ় বিশ্বাস| তবে এই পুরো বিয়োগান্তক ঘটনার জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন নিজেরই শ্যালক ওবায়দুরকে| মাসুম বিল্লাহর দাবি অনুযায়ী, তার শ্যালক ওবায়দুরই ছিল এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড| পড়াশোনার বা কোচিংয়ে যাওয়ার নাম করে ওবায়দুরই মরিয়মকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে এমপি নজরুলের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিত এবং এই অসম সম্পর্কের মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করত সে| একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে এবং অব্যাহত হুমকির মুখে পড়ে গত জুন মাসে অনেকটা নিরুপায় হয়েই শরিয়ত অনুযায়ী এমপির সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে দিতে বাধ্য হয় তার পরিবার|
এই আত্মহত্যার ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় মোড় হলো ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক সুইসাইড নোট বা চিরকুট| নিহতের বাবা মামলার এজাহারে প্রথমে একটি চিরকুট পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও, পুলিশের ভাষ্যমতে ক্রাইম সিন থেকে মোট পাঁচটি আলাদা চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে| এই চিরকুটগুলোর বক্তব্য অত্যন্ত আবেগঘন এবং সেখানে চরম মানসিক বঞ্চনার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে| সাদা কাগজের দুটি আলাদা পাতায় লাল কালি দিয়ে লেখা ছিল চরম হতাশা ও ভালোবাসায় প্রতারিত হওয়ার কথা| সেখানে লেখা ছিল যে, পুরুষটি ছিল অন্য এক নারীর স্বামী এবং কাগজে-কলমে তার স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকারেই ছিল| মরিয়ম নিজেকে বোকা আখ্যা দিয়ে আক্ষেপ করে লিখেছেন যে, অন্য কারও স্বামীকে তিনি নিজের শখের পুরুষ বানিয়েছিলেন| সেখানে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় আরও লেখা ছিল, কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে চিরতরে হারিয়ে ফেলা অনেক বেশি সম্মানের, কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার মতো কোনো সাধারণ বিষয় নয়| ভালোবাসা সম্পূর্ণ হতে হয়, নতুবা তা চিরকাল অপূর্ণই থেকে যায়| অপর একটি সাদা কাগজের চিরকুটে লেখা ছিল যে, তিনি শুধু মায়ায় পড়ে বারবার ওই পুরুষের কাছে নত হয়েছেন, নতুবা তাকে যতটা সস্তা ভাবা হচ্ছে তিনি ততটা সস্তা নন|
এই চিরকুটগুলোর বাইরেও ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’-এর অফিশিয়াল প্যাডে কালো কালিতে লেখা আরও দুই পাতার চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে, যা এই আত্মহত্যার রহস্যকে আরও বেশি ঘনীভূত করেছে| পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাল কালিতে লেখা চিরকুটের হাতের লেখার সঙ্গে জাতীয় সংসদের প্যাডে কালো কালিতে লেখা চিরকুটের হাতের লেখার দৃশ্যমান অমিল রয়েছে| কালো কালির একটি চিরকুটে লেখা ছিল যে, তিনি অতি বিশ্বাসের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিলেন কিন্তু জিততে না পেরে শেষ পর্যন্ত ময়দানে হেরে গেছেন| কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যুদ্ধের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে তিনি অভাবনীয়ভাবে আবিষ্কার করেছেন তার পক্ষের সেনাপতি আসলে বিপক্ষ দলের| অপর একটি চিরকুটে প্রতারিত হওয়ার তীব্র আক্ষেপ ঝরে পড়েছে| সেখানে লেখা হয়েছে যে, তিনি অপর পক্ষকে প্রবলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন বলেই তারা তাকে ঠকিয়ে জিততে পেরেছে| ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রাখার কথা উল্লেখ করে সেখানে প্রচ্ছন্ন হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, ওই হাসিই হবে প্রতারকের ধ্বংসের মূল কারণ| এছাড়া লাল কালিতে লেখা আরেকটি সাদা কাগজে ১২-০৭-২০২৬ তারিখ উল্লেখ করে তার নিচে ঘুমের আগের বিভিন্ন আমল ও পবিত্র সূরার কথা লেখা ছিল|
রোববার রাতে শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা এই প্ররোচনার মামলায় এক নম্বর প্রধান আসামি করা হয়েছে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে| দ্বিতীয় আসামি হিসেবে রয়েছেন তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং তৃতীয় আসামি করা হয়েছে মরিয়মের মামা সেই ওবায়দুরকে| মামলা দায়েরের পর পুলিশ হেফাজতে থাকা এমপি নজরুল ও মাকছুদাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়| সোমবার দুপুর ৩টার দিকে হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট এবং গায়ে ভারী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে তাদের এজলাসে তোলা হয়| মামলার মূল রহস্য উদঘাটন এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামসুজ্জোহা সরকার আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে লিখিত আবেদন করেন| আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান এমপি নজরুলের বয়স, তার বর্তমান পারিবারিক অবস্থান এবং বিশেষ করে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে রিমান্ডের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং অবিলম্বে জামিন প্রার্থনা করেন|
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী অত্যন্ত জোরালোভাবে রিমান্ডের পক্ষে তার আইনি যুক্তিগুলো তুলে ধরেন| তিনি মামলার এজাহারের বিস্তারিত বিবরণ, মৃত্যুর আগে উদ্ধার হওয়া চিরকুটের মর্মস্পর্শী বক্তব্য এবং তাদের মধ্যকার তীব্র পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি আদালতের সামনে শক্তভাবে উপস্থাপন করেন| একই সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের প্রেক্ষাপট, আসামিদের মানসিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং চিরকুটে আসামিদের সরাসরি সম্পৃক্ততার দিকগুলো তিনি বিশদভাবে তুলে ধরেন| উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল ইসলামের আদালত মূল আসামি গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন|
চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তের বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার দুপুরে মরিয়মের লাশ তার পরিবারের কাছে যথাযথভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে| আসামিদের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, রিমান্ডে তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং এরপরই এই মৃত্যু রহস্যের বিষয়ে বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো সম্ভব হবে| অন্যদিকে, রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে কড়া নিরাপত্তায় গাড়িতে ওঠার সময় অভিযুক্ত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে জোরালো দাবি করেন| তিনি জোর গলায় বলেন যে, ঘটনার সময় তিনি আদৌ ওই বাসাতে উপস্থিত ছিলেন না এবং মরিয়ম সম্পূর্ণ নিজ থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে| আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার দুপুর ২টার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরিয়মের নিথর দেহ নিয়ে তার পরিবার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে, আর পেছনে রেখে যায় ক্ষমতার দাপট ও পারিবারিক বঞ্চনার এক করুণ ও অমীমাংসিত উপাখ্যান|