প্রতি বছর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এলেই ঘরমুখী মানুষের মনে একটি পরিচিত আতঙ্ক ভর করে—সড়কের যানজট। এবার ঈদের সম্ভাব্য তারিখ আগামী ২৭ মে। তবে এবারের ঈদযাত্রায় যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শঙ্কা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মে মাসের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিপাত এবং কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হানতে পারে। বৃষ্টির কারণে এমনিতেই মহাসড়কে যানবাহনের গতি ধীর হয়ে যায়, তার ওপর যদি মহাসড়কের পাশে অবৈধ পশুর হাট বসে, তবে পরিস্থিতি যে চরম আকার ধারণ করবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জ
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মহাসড়কের পাশে এবং অনেক ক্ষেত্রে সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। সরকারের তরফ থেকে এবারও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানানো হয়েছে যে, কোনোভাবেই মহাসড়কে বা এর আশপাশে পশুর হাট বসতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এবং সাধারণ যাত্রীরা অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে খুব একটা স্বস্তি পাচ্ছেন না।
হাইওয়ে পুলিশের গত বছরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কোরবানির ঈদে দেশের মহাসড়কগুলোর পাশে অন্তত ২০০টির বেশি পশুর হাট বসেছিল। এই হাটগুলোর ক্রেতা-বিক্রেতা এবং পশুর ভিড় অবধারিতভাবেই মহাসড়কে চলে আসে। অনেক সময় দেখা যায়, পশুবাহী বড় ট্রাকগুলো সরাসরি মূল সড়কের ওপর দাঁড় করিয়ে গরু ওঠানো-নামানো হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সাভার এবং ঢাকা-ময়মনসিংহের মতো দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে কোরবানির ঈদের আগের কয়েক দিন যাত্রীবাহী বাসের পাশাপাশি হাজার হাজার পশুবাহী ট্রাক চলাচল করে। এই বিপুল যানবাহনের চাপে সড়কে এমনিতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, তার ওপর হাটের কারণে গতি কমে গেলে তা যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তিতে রূপ নেয়। নতুন সরকার তাদের এই ‘মহাসড়কে হাট নয়’ ঘোষণাকে মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
গতি বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রশাসনিক উদ্যোগ
ঈদযাত্রার সার্বিক পরিস্থিতি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সম্প্রতি খোদ প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহাসড়কে পশুর হাট না বসতে দেওয়ার পাশাপাশি যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বৈঠকে বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে:
টোল প্লাজায় পস (POS) মেশিন: মহাসড়কে গাড়ির গতি বাড়াতে এবং টোল আদায়ের জট কমাতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১২টি সেতুর টোল প্লাজায় আধুনিক পস মেশিন বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রুত টোল আদায় সম্ভব হবে এবং যানবাহনের দীর্ঘ সারি কমবে।
ভাড়ার নৈরাজ্য রোধে ম্যাজিস্ট্রেট: উৎসবের এই সময়ে একশ্রেণির অসাধু পরিবহন ব্যবসায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে যাত্রীদের জিম্মি করে। এই নৈরাজ্য কঠোর হাতে দমনের জন্য এবার মাঠে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, হাইওয়ে পুলিশের সতর্কতা এবং আবহাওয়ার আনুকূল্য—এই বিষয়গুলোর ওপরই নির্ভর করছে এবারের ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রার স্বস্তি। সরকার যদি মহাসড়ক থেকে পশুর হাট দূরে রাখার ঘোষণাটি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তবেই হয়তো এবারের ঈদযাত্রা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা