• সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২:৫৮ অপরাহ্ন

মামুলি ভিসানীতিতে কেন এতো বেদনা!

Reporter Name / ৪৬ Time View
Update : রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৩

রিন্টু আনোয়ার=

==========

মুখে এবং ভাবভঙ্গিতে মার্কিন ভিসানীতিকে ডেমকেয়ার করছে সরকার। বলছে, এটা তেমন কিছু নয়। এসবে কিছু যায় আসে না। তারা(যুক্তরাষ্ট্র) দেশে-দেশে এমন ভিসানীতি দিয়েই থাকে। তাই এ নিয়ে মনে কোন ভয় নেই। মাথায় কোন চিন্তা নেই। অথচ বাস্তবে মনে আর মাথায় এক কঠিন বিপদের বার্তা লক্ষনীয়। তা লুকাতে গিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বেফাঁস নানা মন্তব্যে বরং তা দিন দিন আরো ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কারো কারো মধ্যে স্যুয়োমোটু হয়ে নিজ থেকেই বেফাঁস মন্তব্যে নাম ফাঁস করে দেয়ার প্রবণতাও লক্ষনীয়। কেউ বলছেন,এসব ভিসা রেস্ট্রিকশন-স্যাংশনে তিনি বা তারা কেয়ার করেন না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজ থেকে বলেছেন, তার ছেলে জয়ের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সকল কিছু বাজেয়াপ্ত করলে কিচ্ছু যায় আসে না। তার এ বক্তব্যের মাঝে মানুষ অন্তত একটি নাম জেনে নিয়েছে। ঢাকা মেট্রপলিটন পুলিশ-ডিএমপির মুখপাত্র ফারুক হোসেন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের ওপর ভিসানীতি প্রয়োগ হয়েছে। আর এতে পুলিশের ইমেজ সঙ্কট হবে না বলে জানিয়েছেন স্বয়ং আইজিপি।
ভিসানীতিতে কার নাম আছে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই তা প্রকাশ বা প্রচার করে না। সচরাচর তারা যে দেশের যে ব্যক্তিকে ভিসা রেস্ট্রিকশন দেয় তাকেই জানায়। বড় জোর জি টু জি (সরকার থেকে সরকার) জানে। সেটাও টপ সিক্রেটে শীর্ষ পর্যায়ে। কিন্তু, বাংলাদেশে সোশাল মিডিয়াসহ সবার মুখে মুখে সমানে নামধাম প্রকাশের যেন উৎসব চলছে। ‘ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাইনার’ মতো তাদের এ প্রবণতা। অতি উৎসাহী মহলের মধ্যে বিচারপতি, মন্ত্রী, আমলা, শীর্ষ সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ কিছু সাংবাদিকদেরও নামধাম দিয়ে ভিসা রেস্ট্রিকশনে পড়াদের তালিকা প্রচারের এক ধুম পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বার বার বলছে, তাদের ভিসানীতির একমাত্র উদ্দেশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন। আর মূল লক্ষ হচ্ছেন, নির্বাচনের পথে বাঁধা দেওয়া ভয়ঙ্কর ব্যক্তিরা। যে ব্যক্তিরা বাংলাদেশে সবার কাছে প্রায় চিহ্নিত। তারা গত দুটির মতো সামনেও একটি একতরফা নির্বাচনের আয়োজনে মত্ত। তাই তা আন্তর্জাতিক মহলেরও জানার বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের জন্য বছরের শুরু থেকেই সরকারকে নানাভাবে চাপ দিয়ে আসছে। সরকারও তাদের কাছে নিরপেক্ষতার ওয়াদা দিয়ে আসছে। কিন্তু,তারা পরক্ষণেই আবার বলছে, বিদেশিরা কেন আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে? যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও ভেজাল হয়।
তা হলে আসল কথা কোনটা? বাংলাদেশে বা বাঙালির সঙ্গে যা চলে বা চালানো যায়, বিদেশিদের সঙ্গে অবিরাম তা চালানো যায় না। সমস্যাটা বেঁধেছে এখানেই। এ পর্যন্ত কূটনৈতিক মহলে যতগুলো বৈঠক হয়েছে তার সবগুলো বৈঠকে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার আশ্বাস দিয়ে আসছে দল ও সরকার। তার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নতুন করে ব্যক্তি পর্যায়ে ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণা দেয়ায় রহস্য কি ক্ষমতাসীনরা আসলে জানে! তবে এটা যে একটি বড় রকমের তাড়নায় ফেলে দিয়েছে তাদের সেটা বুঝার জন্য বুদ্ধিজীবী হওয়ার দরকার হয় না। কখনো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে কেয়ার করার সময় নাই। লাগলে পাল্টা স্যাংশন দেয়ার কথাও বলছেন শীর্ষ পর্যায়সহ আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ। পরক্ষণেই আবার বলছেন, মার্কিন ভিসানীতি বিরোধী দলের জন্যও প্রযোজ্য। যারা সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধা দেবে তাদের ওপর ভিসানীতি প্রয়োগ হবে। বিএনপি নির্বাচনবিরোধী দল, তাদের ওপরও সেটা বর্তাবে। এসব নানানমুখী কথার মাঝে আবার যুক্তরাষ্ট্রের গুডবুকে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টাও লক্ষনীয়। সরকারী ভাবে সেলফি প্রচার করে তা প্রমাণের চেষ্টা। কর্মীদের একটা বুঝ দেয়ার প্রাণপণ বাতাবরণ।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো যে তাদের অবস্থান থেকে সরছে না সরকারও তা ভালো করে জানে। তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে অনেকটা ছাঁই দিয়ে ধরার মতো ধরেছে বাংলাদেশকে। এর বাইরেও বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র ও সংস্থা বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় বলে সরকারকে জানিয়ে আসছে। সরকারও কথা দিচ্ছে। ওয়াদা করছে। এরপরও কেন বাংলাদেশের জন্য নতুন ভিসানীতি ঘোষণা? নিজ্র্জলা সত্য হচ্ছে- সরকারের মতিগতি, চালাকি; বিরোধীদলকে নাকানিচুবানিসহ পাতানো নির্বাচনের যাবতীয় হাঁড়ির খবর জানে যুক্তরাষ্ট্র। তাই তাদের সাফ বার্তা, বাংলাদেশে নির্বাচনে জালিয়াতি ও নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করায় জড়িতদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেয়া হবে না। সরকারী মহল যেভাবে বলছে, একটি দেশে ভিসা না দিলে কী হয়? একটি দেশ আর যুক্তরাষ্ট্র এককথা নয়। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাজ্য-কানাডাসহ আরো কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাই কার্যকর করে নিজ নিজ দেশে। এর চেয়ে বড় কথা এসব দেশে পাচার করা অবৈধ অর্থ আর ফেরত না পাওয়া নিয়ে। বেশীর ভাগ ভিসা রেস্ট্রিকশন-স্যাংশন খাওয়াদের ভিতরে ভিতরে মূল বেদনা সেখানেই। যা মুখ দিয়ে বলা যাচ্ছে না। তারা দেখছেন-কেবল ভিসা স্যাংশন নয়,প্যান্ডোরা-বাক্স আরো খুলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশস্থ মার্কিন দূতাবাস বলেছে সূক্ষ্মভাবে তথ্য সংগ্রহ করে সতর্কতার সঙ্গে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে যার বিবরণ প্রকাশ করা হবে না। এই আশ্বাস আরো ভয়ের খড়গ অর্থ পাচারকারীসহ বিদেশে সম্পদ গড়ার কারিগরদের কাছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতোই বলছে, ভিসা বিধিনিষেধ থাকা বাংলাদেশের লোকদের নাম বা সংখ্যা প্রকাশ করবে না তারা তারপরও জড়িতদের ভয় কাটছে না। বরং তাদের ভয় দিন দিন আরো বাড়ছে। তারপর আবার মার্কিন সরকার এই নীতি ঘোষণা করার পর থেকে সবকিছু খুব কাছ থেকে নিবিড়ভাবে দেখেছে বলে জানিয়েছে। সেটি আরো ভয়ের বিষয় এ চক্রের কাছে। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনোভাবে বুঝিয়ে ২০১৪ এবং ২০১৮ এর মতো নির্বাচন করে নৌকা বেয়ে নদী পার করে নিয়ে যেতে পারবে বলে ধারণা দিয়েছিলেন তারা পড়েছেন চরম অস্বস্তিতে। সম্প্রতি দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনে ভারত যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির ব্যাপারে বুঝাতে চেয়েছিলেন তাও কাজে লাগেনি। খালিস্তান আন্দোলন নিয়ে ক্যানাডার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে হঠাৎ করে বদলে ফেলবে তা কেউ চিন্তা করতে পারেননি। স্নায়ু-যুদ্ধের সময় পরিস্থিতি এমনিভাবে দ্রুত বদলে যায়, বিগত স্নায়ু-যুদ্ধের সময়েও তাই হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশস্থ রাষ্ট্রদূত পিটার হাস দায়িত্ব নেয়ার পরপরই বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অন্য কারো চশমা দিয়ে দেখে না। তখন তার বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব দেননি। সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় প্রবাদের কথা ভুলে গিয়েছিলেন ক্ষমতাসীনরা। বিশ্ব কূটনীতিতে ভারতের নেতিয়ে পড়া ভরসার প্রশ্নে কিছুটা অস্বস্তিকর অবস্থায় এখন তারা।
ভারত আগের মতো গায়েগতরে খেটে হলেও সব করে দেবে সেই বাস্তবতা এখন আর নেই বলে সূত্রে প্রকাশ। ভারতেও চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় নির্বাচন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অবস্থানও আগের অবস্থায় নেই। এ সময়ে চীন-রাশিয়ার আগ বাড়িয়ে বর্তমান সরকারের পাশে থাকার ঘোষণাও আরেক অস্বস্তি। দেশ দুটিই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের হস্তক্ষেপের বেশি বেশি সমালোচনা করে সরকারকে চীন-রাশিয়া পন্থি ঘেঁষার ‘সিল’ খাইয়ে বেকায়দা অবস্থায় ফেলছে। এই অবস্থা থেকে কায়দা করে সেইফ পজিশন নেয়ার রাস্তা সংকীর্ণ করে দিচ্ছে। করে দিচ্ছে কিছুটা বেসামালও। এর আগে কখনো এতোটা কাবু হয়নি সরকার। বরং কোনো না কোনো অপশনে উৎরে গেছে। এবার এখন পর্যন্ত সে ধরনের লক্ষণ নেই। অক্টোবের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাজ্য-কানাডাসহ পশ্চিমা আরো কয়েকটি শক্তিধর দেশের ফাইনাল রাউন্ডে নামার কথা শোনা যাচ্ছে। তারা মার্কিনিদের মতো বেশি সময় নেয় না। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের গনতন্ত্রের একটি রসায়ন চলমান বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশে রয়েছে প্রতিবেশি ভারতীয় গণতন্ত্রের কিছু মিশেলও। সেই ভারতেরই এখন বেগতিক দশা। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০১৪ এবং ২০১৮-তে পর পর দুটি প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের পেছনে ভারত বর্তমান সরকারকে একচেটিয়াভাবে ক্ষমতাসীন করেছে, ক্ষমতায় টিকিয়েও রেখেছে। সেই হিসেবে আগামীতে ভারত, গেল দুবারের মতো না পারলেও যদ্দুর সম্ভব ভূমিকা রাখার আশাবাদ ছিল আওয়ামী লীগের। সেখানে এখন তৈরী হয়েছে বিশাল ছন্দপতন।
রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে পুরানো স্নায়ুযুদ্ধের শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বর্তমান স্নায়ু-যুদ্ধের সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু বানাতে গিয়ে ভুল চালের খেসারতে পড়েছে ভারত। কয়েকমাস পর দেশটির লোকসভার নির্বাচন। এরমধ্যে‌ই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঝামেলা পেকেছে কানাডার সঙ্গে। তা এখন জটিল এবং বেশ ভয়াবহ পর্যায়ে। হারদ্বীপ সিং নিজ্জার হত্যার বিচার চেয়ে কানাডায় ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনগুলোর সামনে বিক্ষোভ করেছে দেশটির শিখরা। জাস্টিন ট্রুডো সরকারের বিরুদ্ধে পাল্টা বিক্ষোভ হয়েছে নয়াদিল্লীতেও। কানাডার সঙ্গে এমন কূটকাইজ্জার জেরে ভারতের আপাতত বাংলাদেশ বা আওয়ামী লীগকে প্রনোদিত করার সময় দেয়ার সুযোগ কম। দিল্লী বারবার ওয়াশিংটনকে বার্তা দিতে চেয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় না রাখলে বাংলাদেশ চীনা বলয়ে ঢুকে যাবে। এখন দিল্লী বার্তা দিচ্ছে কানাডা চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলে তারাই চীনের বুকে ঝুঁকে পড়বে। আর তাই এ রকম সময়েই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় ক্ষত তৈরির হোতাদের টার্গেট করে মার্কিন ভিসানীতি। এর পরিণতি ভেবে কারো কারো আতঙ্কিত হবার কারণ অবশ্যই রয়েছে। তাদের সকলের আমলনামা এখন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমাদের হতে। তারা এখন সব জানে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category