• শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট, ভোট হবে যেভাবে

Reporter Name / ২ Time View
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলো রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ কয়েক দশকের আনুষ্ঠানিকতা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের চেনা বৃত্ত ভেঙে এবার জাতীয় সংসদে ব্যালট যুদ্ধের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। দেশের আইনপ্রণেতা অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রের পরবর্তী অভিভাবক। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল অনুযায়ী, একই দিনে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শেষে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনের ভেতরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। স্পিকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের যৌথ সমন্বয়ে এই ঐতিহাসিক ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে এই ভোটগ্রহণের জন্য বিশেষ বুথ স্থাপন করা হবে। মোট ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য এই নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। সংসদ সদস্যরা তাঁদের নির্দিষ্ট আসন নম্বর ও পরিচয় নিশ্চিত করে ভোটকক্ষে প্রবেশ করবেন। ভোটপ্রক্রিয়াটি সাধারণ ভোটারদের মতো গোপনীয় ব্যালট পেপারের নয়, বরং এতে বিশেষ নিয়ম অনুসরণ করা হবে। নির্বাচন বিধিমালার আওতায় সংসদ সদস্যদের হাতে সরবরাহকৃত ব্যালট পেপারে প্রার্থীদের নামের তালিকা থাকবে। ভোটারদেরকে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীর নামের ঘরে নিজ নাম ও সংসদীয় আসন নম্বর স্পষ্টভাবে লিখে ভোট প্রদান করতে হবে। ফলে এই প্রক্রিয়ায় কে কোন প্রার্থীকে সমর্থন দিলেন, তা সরাসরি শনাক্ত করার সুযোগ থাকবে।
রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন। বর্তমান রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পিকার মহোদয় নির্ধারিত সময়ে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেবেন। ভোটগ্রহণের পুরো দৃশ্যপট গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে সরাসরি সম্প্রচারের আওতায় থাকবে, যাতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সার্বিক পরিস্থিতি দেশবাসী তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন। যদি নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই অর্থাৎ বিকেলের আগেই উপস্থিত সকল সংসদ সদস্যের ভোটদান সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবেই ব্যালট পেপার গণনা ও ফলাফল প্রস্তুতের কাজ শুরু করবেন। অন্যথায় বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ পর্ব সমাপ্ত ঘোষণা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উপস্থিতিতে ফলাফল প্রস্তুত ও ঘোষণা করা হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদ। যেহেতু সংবিধানে এখনও ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল রয়েছে, সেহেতু আইন অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দিতে পারবেন না। দলীয় সিদ্ধান্তের বিপরীতে গিয়ে ভোট প্রদান করলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ওপর ব্যালট পেপারে সংসদ সদস্যের নাম ও আসন নম্বর লেখার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিষয়টি কার্যত প্রকাশ্য রূপ ধারণ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যালট যদি সম্পূর্ণ গোপন হতো, তবে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা সত্ত্বেও ক্রস ভোটিং বা স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তের কিছুটা অবকাশ থাকতো। কিন্তু বর্তমান কাঠামোর কারণে দলীয় আনুগত্যের বাইরে কোনো বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
এই নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ বেশ গতিশীল হয়ে উঠেছে। সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আইনপ্রণেতাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলটির প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নির্বাচনটিকে একতরফা বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার তকমা থেকে মুক্ত রাখতে ১১ দলীয় বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর মতে, দেশের সর্বোচ্চ পদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা উচিত এবং এর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চাকে দৃশ্যমান করা সম্ভব।
নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঘিরে জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারের বিষয়টিও সংসদীয় মহলে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। জুলাই সনদের মূল অঙ্গীকার ছিল ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যালটের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করা। যদিও বর্তমান নির্বাচনটি প্রচলিত পুরোনো বিধি ও সাংবিধানিক কাঠামোতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তবে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের তরফ থেকেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, গণতান্ত্রিক কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য আনতে আগামী সংসদ অধিবেশনেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে। সম্পূর্ণ নতুন করে সংবিধান না লিখে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে মিল রেখে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার বিষয়েই ঐকমত্য গড়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে ৩৪৯ জন আইনপ্রণেতার ভোটের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য কে বসছেন বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ মসনদে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধান, সংসদ সচিবালয়ের সাচিবিক সহায়তা এবং গণমাধ্যমের সরাসরি উপস্থিতিতে এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠান শুধু একটি সাংবিধানিক রুটিন প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category