বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়মুক্তির এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া। চুক্তির মারপ্যাঁচে আপাত-নিয়মতান্ত্রিক আইনি রূপ দেওয়া হলেও, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই একে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের বৈধ হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই নীতি এখন দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে, যার কারণে গত দেড় দশকে সরকারের ক্যাপাসিটি চার্জের আর্থিক বোঝা বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে এই বিপুল অর্থ পরিশোধের সরাসরি চাপ এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটার পরও পিডিবির লোকসান ও ঋণের বোঝা কমছে না।
বিদ্যুৎ খাতের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎ মিলিয়ে মোট ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে। অথচ দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসার পরও গ্রীষ্মকালের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উঠছে না। এমনকি শীতকালসহ বছরের বাকি সময়ে দেশে গড়ে দৈনিক মাত্র ১২ হাজার মেগাওয়াট হারে বিদ্যুৎ উৎপাদিত ও ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ, দেশের প্রকৃত চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি অলস উৎপাদন সক্ষমতা জোর করে তৈরি করে রাখা হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কোনো ক্যাপাসিটি চার্জের নিয়ম না থাকলেও, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য এটি বাধ্যতামূলক। যার ফলে কেন্দ্রগুলো থেকে এক ইউনিট বিদ্যুৎ না নিলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী তাদের শতভাগ ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ গুনে যেতে হচ্ছে সরকারকে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর অজুহাতে বিতর্কিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন’ বা বিশেষ দায়মুক্তি আইন প্রণয়ন করে। এই কালো আইনের আওতাতেই মূলত প্রতিযোগিতা ছাড়া ও টেন্ডারবিহীনভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছিলেন যে, আগের ১৪ বছরে কেবল ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে পরিশোধ করেছে সরকার। বর্তমানে দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট এবং সরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৫৫টি, যার সক্ষমতা ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বিদ্যুৎ খাতের এই হরিলুট নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, “বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংস্কারের নামে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বসিয়ে রেখে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লাখ লাখ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এখন পূর্ববর্তী আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এই অন্যায্য চুক্তিগুলো চাইলেও সহজে বাতিল বা পর্যালোচনা করা যাচ্ছে না।” বিদ্যুৎমন্ত্রী আরও জানান, ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই আইন मंत्रालয়ের সুনির্দিষ্ট মতামত চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বার্ষিক হিসাব পর্যালোচনা করলে বছর বছর এই দায় বৃদ্ধির এক ভয়াবহ রূপ ফুটে ওঠে:
২০১১-১২ অর্থবছর: এই অর্থবছরে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ দেওয়া হয়েছিল ৫ হাজার ৪৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, যেখানে বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ক্যাপাসিটি চার্জের গড় খরচ ছিল ২ টাকা ৩৫ পয়সা। ওই সময়ে দেশে খুচরা বিদ্যুতের মূল্য ছিল প্রতি ইউনিট মাত্র ৩ টাকা ৭৬ পয়সা।
২০২২-২৩ অর্থবছর: বড় বড় বেশ কয়েকটি মেগা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ার পর এক লাফেই ইউনিটপ্রতি ক্যাপাসিটি চার্জের খরচ দাঁড়ায় ৩ টাকা ৫৫ পয়সা।
২০২৪-২৫ অর্থবছর: এই অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় রেকর্ড ৪৫ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, এবং ইউনিটপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ৫ টাকা ২৪ পয়সা।
২০২৬-২৭ অর্থবছর (প্রাক্কলিত): বিইআরসি-র প্রাক্কলন অনুযায়ী, আসছে অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ৯ হাজার ৬৩৬ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা বাবদ মোট ৫ লাখ ২৬ thousand ৮১ কোটি টাকা খরচের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদই সরকারের খরচ হবে রেকর্ড ৫২,৬১৫ কোটি টাকা, যা এককভাবে ইউনিটপ্রতি দাঁড়াচ্ছে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা।
ক্যাপাসিটি চার্জের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণেই ২০১০ সালে যেখানে প্রতি ইউনিট খুচরা বিদ্যুতের দাম ছিল ৩ টাকা ৭৬ পয়সা, বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৯৯৮ সালে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (কেপিসিএল) ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে দেশে এই ‘ফিক্সড কস্ট’ বা ক্যাপাসিটি চার্জের ক্ষতিকর সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল। ২০১০ সালের পর যখন অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা রাজনৈতিক কারণে জ্যামিতিক হারে বাড়ানো হতে থাকে, তখন থেকেই এটি দেশের অর্থনীতির জন্য প্রধান ক্যান্সার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা দেশের শীর্ষ সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম এই সংকট প্রসঙ্গে বলেন, “বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জ যে আসলে আইনি মোড়কে একটি পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের প্রকল্প, তা আমরা বহু বছর ধরে প্রমাণসহ বলে আসছি। পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অন্যায্য ও লুণ্ঠনমূলক চুক্তির কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। এখন যদি এই চুক্তিগুলো সংস্কারে আইনি বাধা থাকে, তবে জরুরি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন সংশোধন করে এই চুক্তিগুলো বাতিল করতে হবে।”
অধ্যাপক শামসুল আলম আরও জোর দিয়ে বলেন, বিদ্যুৎ খাতে এই দীর্ঘমেয়াদি ও ভোক্তার স্বার্থবিরোধী দেশবিরোধী চুক্তির জন্য যারা সরাসরি দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা উচিত। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক বিদ্যুৎ সচিব আহমেদ কায়কাউস, সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ এবং সাবেক বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলামের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার জোর দাবি জানান তিনি।