• মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন
Headline
বাফার স্টক না থাকায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি দেশের অর্থনীতি আমলাতান্ত্রিক গ্যাঁড়াকলে রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ: দেশি ট্যাংকার ভাড়ায় বিদেশে, চড়া প্রদেয় মূল্যে বিদেশি জাহাজে আসছে জ্বালানি ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসকদের রমরমা বাণিজ্য হাজব্যান্ড থিংস! অনাহার ও তোষণনীতি: রাজনৈতিক কাঠামোর কাছেই জিম্মি সাধারণ মানুষ আসন্ন বৈশ্বিক খাদ্যসংকটের পদধ্বনি: ফোর-এফ সংকটের মুখে কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ? লোকসানের ফাঁদে আউশ: কেবল প্রণোদনা নয়, কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা জরুরি দাঁড়িয়ে থাকার ফলে কোমর ব্যথা হলে কী করবেন? ১০১ শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা পদক প্রদান করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রিজন ভ্যান খুলে দেন এসআই প্রদীপ, প্রাইভেট কারে পালান পিচ্চি রাজা

লোকসানের ফাঁদে আউশ: কেবল প্রণোদনা নয়, কৃষকের লাভ নিশ্চিত করা জরুরি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে সরকার এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আউশ ধানের আবাদ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা চরম হতাশাজনক। বীজ, সার ও নগদ প্রণোদনার মতো নানা সরকারি সহায়তা এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম সত্ত্বেও কৃষকরা আউশ চাষে ক্রমশ আগ্রহ হারাচ্ছেন। আউশের আবাদ না বাড়ার মূল কারণ মূলত অর্থনৈতিক; উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বাজারদর কম হওয়ায় এটি এখন কৃষকের জন্য একটি নিরেট লোকসানি ফসলে পরিণত হয়েছে। কৃষকের কাছে আউশ লাভজনক না হওয়া পর্যন্ত কেবল প্রণোদনা দিয়ে এই ফসলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

একসময় বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আউশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী দশকে দেশের মোট আবাদি জমির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জমিতে আউশের চাষ হতো। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে দেশে ৩৪ লাখ ২১ হাজার হেক্টর (মোট আবাদি জমির ৩০ শতাংশ) জমিতে আউশ চাষ হয়েছিল, যার উৎপাদন ছিল ৩২ লাখ ৩০ হাজার টন। কিন্তু পরবর্তীতে সেচনির্ভর উচ্চফলনশীল বোরো ধানের বিস্তার এবং অন্য অর্থকরী ফসলের দিকে কৃষকের ঝোঁক বাড়ায় আউশের আবাদ ব্যাপক হারে কমতে থাকে। কমতে কমতে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আউশের আবাদ মাত্র ৯ লাখ ৬ হাজার হেক্টরে নেমে আসে। পরবর্তীতে বড় আকারের সরকারি প্রণোদনার কারণে ২০১৭-১৮ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে আউশের আবাদ কিছুটা বাড়লেও সেই ধারা টেকেনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আউশের আবাদ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ লাখ ৪৫ হাজার হেক্টরে, যা ২০০৬-০৭ সালের সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে সামান্য বেশি। বর্তমানে দেশের মোট ধান আবাদি জমির মাত্র ৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে আউশ চাষ হচ্ছে।

আউশ চাষ থেকে কৃষকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রধান কারণ এর বিপুল আর্থিক ক্ষতি। মাঠপর্যায়ের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে আউশ ধানের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ২৬ থেকে ২৭ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি তা ১ হাজার ৫০ টাকার বেশি। অথচ স্থানীয় বাজারে কৃষকদের সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা দরে। এর ফলে বিঘাপ্রতি কৃষকের সরাসরি লোকসান হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি আউশের গড় ফলনও তুলনামূলকভাবে বেশ কম। আউশে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ দশমিক ১৫ টন, যা হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল বোরো ধানের (৪ টনের বেশি) তুলনায় অনেক পিছিয়ে। সরকার ধান সংগ্রহ কর্মসূচিতে আউশকে অগ্রাধিকার না দেওয়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং বাধ্য হয়েই বেশি লাভজনক বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব আউশ আবাদকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বোরো কাটার পর এপ্রিলে-মে মাসে আউশের জমি প্রস্তুত করতে হয়, যা মূলত বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে কৃষককে বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে, ফলে ডিজেল ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচে উৎপাদন ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মতো শুষ্ক এলাকায় তাপমাত্রার বাড়তি চাপ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে। আবার জুলাই-আগস্ট মাসে ধান কাটার সময় অতিবৃষ্টির কারণে ধান শুকানো ও সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। ভেজা ধান মজুত রাখতে না পেরে কৃষক বাধ্য হন অনেক কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ফসল তুলে দিতে।

ভূগর্ভস্থ পানির মজুত রক্ষার্থে বোরো ধানের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে আউশের প্রসার ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে কৃষকের ঘাড়ে লোকসানের বোঝা চাপিয়ে পরিবেশ রক্ষার এই নীতি কখনোই টেকসই হতে পারে না। আউশের আবাদ বাড়াতে হলে শুধু বিনামূল্যে বীজ বা সার দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রথমত, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে উন্নত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণের প্রসার ঘটাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে (ব্রি) স্বল্প সময়ে অধিক ফলনশীল এবং খরা ও তাপসহিষ্ণু নতুন জাত মাঠপর্যায়ে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বোরো ও আমনের মতো আউশ মৌসুমেও সরকারি ব্যবস্থাপনায় ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রণোদনার মূল লক্ষ্য শুধু ‘কত জমিতে আউশ হলো’ সেই পরিসংখ্যান বাড়ানো হতে পারে না, বরং ‘কৃষক আউশ করে আর্থিকভাবে কতটা লাভবান হলেন’—এটাই হওয়া উচিত মুখ্য বিবেচ্য। উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, প্রযুক্তির প্রসার ও ন্যায্যমূল্যের সমন্বিত নিশ্চয়তা পেলেই কৃষক পুনরায় আউশ চাষে ফিরে আসবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক খাদ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তাকে সুসংহত করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category