• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ অপরাহ্ন
Headline
চাপ নয়, চাহিদা আছে বলেই বোয়িং কেনা হচ্ছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গাজীপুরে কাভার্ডভ্যান-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৪ হাম ও উপসর্গে আরও ৪ শিশুর প্রাণ গেল ডাক বিভাগের রেকর্ড : ২ মাসে পণ্য পরিবহন ৪০০ টন ভিডিও কলে কথা বলাসহ যেসব সুবিধা পাবেন কারাবন্দিরা দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করায় ২ নারী সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ফিলিস্তিন আখ্যান: প্রোপাগান্ডার নতুন ও ভয়ংকর ফ্রন্টে ইসরায়েল দিলারা জামানের বাড়ি দখলের ঘটনা নিয়ে আলোচনা, অভিনেত্রী যা বললেন কাগজে-কলমে শতভাগ কাভারেজের রেকর্ড: বাস্তবে ওয়ার্ডজুড়ে হামের হাহাকার শিক্ষকদের শেষ সম্বল গিলে খেল সিন্ডিকেট: অবসর তহবিলের ৭ হাজার কোটি টাকা হরিলুটের নেপথ্যে

শিক্ষকদের শেষ সম্বল গিলে খেল সিন্ডিকেট: অবসর তহবিলের ৭ হাজার কোটি টাকা হরিলুটের নেপথ্যে

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সারাজীবন শ্রেণিকক্ষে আলো ছড়িয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের রক্ত-ঘামে অর্জিত পাওনা বুঝে পাওয়ার আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা| বার্ধক্যের শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক অনিশ্চয়তা আর চিকিৎসা ব্যয়ের জোগান দিতে এই অবসরকালীন সঞ্চয়টুকুই থাকে তাদের একমাত্র অবলম্বন| অথচ সেই চরম স্পর্শকাতর ও পবিত্র আমানতের ওপরই চালানো হয়েছে এক নির্মম ও দানবীয় লুটপাট| বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর-সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল তছরুপ ও আত্মসাতের এক নজিরবিহীন ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিধিবহির্ভূতভাবে আমানত রেখে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে আরও প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা আটকে পড়ার করুণ অধ্যায়| ফলে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে নিজের ন্যায্য পাওনা না পেয়ে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার অবসরপ্রাপ্ত অসহায় শিক্ষক-কর্মচারী চরম মানবিক বিপর্যয়ে দিনাতিপাত করছেন|
এই সর্বগ্রাসী অর্থ আত্মসাতের চিত্রটি কোনো সাধারণ অনিয়ম বা খামখেয়ালিপনার ফল নয়, বরং এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এক প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতি| অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের শীর্ষ নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ এই মহালুটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগের আঙুল উঠেছে| নামে-বেনামে ভুয়া ইনডেক্স নম্বর তৈরি, অস্তিত্বহীন মৃত বা ভুয়া শিক্ষকের নামে জাল কাগজপত্র প্রস্তুত এবং সফটওয়্যারের কারসাজির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা একের পর এক তুলে নেওয়া হয়েছে| সাবেক সরকারের আমলে সৃষ্ট এই আর্থিক ক্ষত এতটাই গভীর যে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ দায়িত্ব পালনকালেই প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন যে, শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসর তহবিল থেকে প্রায় সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে| পরবর্তীতে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনও এই ভয়াবহ দুর্নীতির সত্যতা পুনর্ব্যক্ত করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষকদের শেষ জীবনের সম্বল থেকে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এর নেপথ্যে যারা কলকাঠি নেড়েছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে|
তহবিলের এই পুকুরচুরি ও সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার গভীরতা খতিয়ে দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে| শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও আইন শাখার অতিরিক্ত সচিবকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এবং কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা তথা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ফায়িম ফয়সালসহ আরও তিনজন পদস্থ কর্মকর্তাকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে| অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর এই তদন্তের স্বার্থে কমিটির কোনো সদস্যই আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ না খুললেও অবসর-সুবিধা বোর্ডের বর্তমান সচিব মোশাররফ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, বোর্ডের বিগত বছরগুলোর যাবতীয় অনিয়ম, অর্থ পাচার ও জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলতে তদন্ত দল কঠোরভাবে কাজ করছে| তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই তহবিলের টাকা লোপাটের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় জনসমক্ষে উন্মোচন করা হবে|
মূলত ২০২৫ সালে পরিচালিত শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এক বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেই এই দুর্নীতি ও জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রথম দালিলিক আকারে উঠে আসে| ওই অডিট প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ থাকার পরও সেখানে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে ভুয়া ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছিল| এরপর সেই অস্তিত্বহীন সুবিধাভোগীদের নামে আবেদনপত্র দাখিল করে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ছাড় করিয়ে নেওয়া হয়| শুধু তাই নয়, এসব অর্থ উত্তোলনের বিপরীতে যে নির্দিষ্ট সরকারি ফি বা কমিশন জমা হওয়ার কথা ছিল, তা বোর্ডের মূল তহবিলে না গিয়ে বোর্ডের নামেই খোলা গোপন ভুয়া অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়| এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যক্তিগত পকেটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে| এই সুসংগঠিত লুটপাটের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন অবসর-সুবিধা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, যিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন|
অনুসন্ধান ও সরকারি নথিপত্রে দেখা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত টানা প্রায় আট বছর ধরে অবসর বোর্ডের সচিবের পদটি নিজের কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন এই অধ্যক্ষ শরীফ| পুরো অর্থ ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজেশন বা অটোমেশনের নামে তিনি নিজের একান্ত অনুগতদের নিয়ে একটি দুর্ভেদ্য চক্র গড়ে তোলেন| এই উদ্দেশ্যে তিনি বোর্ডের যাবতীয় সফটওয়্যার পরিচালনার জন্য ‘গ্রিন বি সফটওয়্যার’ নামের একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রহস্যজনক চুক্তি সম্পাদন করেন| এই সফটওয়্যার কোম্পানির অন্যতম স্বত্বাধিকারী মোফাজ্জল মওদুদ এলাহী ছিলেন খোদ অধ্যক্ষ শরীফের আপন ভাতিজা এবং তার সঙ্গে অপর অংশীদার ছিলেন গোলাম সারোয়ার| বোর্ডের নিজস্ব প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং এই সফটওয়্যার নির্মাতাদের ত্রিমুখী মেলবন্ধনে এমন একটি প্রযুক্তিগত ফাঁদ তৈরি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শিক্ষকদের ডাটাবেজ নিয়ন্ত্রণ করে অবলীলায় ভুয়া ভাউচার তৈরি ও অর্থ আত্মসাৎ করা সম্ভব হয়েছিল| সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবেই এই চারজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে|
শুধু অভ্যন্তরীণ তছরুপই নয়, বোর্ডের বিধিবদ্ধ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আর্থিক খাতের আরেকটি সর্বনাশা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল| অবসর সুবিধা বোর্ডের সুস্পষ্ট আইন ও পরিচালনা প্রবিধানে সরকারি ব্যাংকে তহবিল সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করা হয়| মোটা অঙ্কের ব্যক্তিগত কমিশন ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধার লোভে পড়ে বোর্ডের তহবিল থেকে শত শত কোটি টাকা ঝুঁকিপূর্ণ সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে মেয়াদি আমানত বা এফডিআর এবং এসটিডি হিসেবে স্থানান্তর করা হয়| শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের হিসাবমতে, এর ফলে বোর্ডের সরাসরি আর্থিক ক্ষতি ও আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা| এই অর্থগুলো জমা রাখা হয়েছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংকে|
পরবর্তীতে শিক্ষকদের অবসরকালীন পাওনা পরিশোধের তীব্র চাপ তৈরি হলে অবসর বোর্ড ওই ব্যাংকগুলো থেকে তাদের নিজস্ব আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য বারবার চিঠি পাঠায়| কিন্তু তারল্য সংকট এবং অনিয়মে জর্জরিত এসব বেসরকারি ব্যাংক শিক্ষাবোর্ডের জমা রাখা সেই অর্থ ফেরত দিতে সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করে| এর ফলে বোর্ডের নগদ আর্থিক সক্ষমতা কার্যত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে এবং নতুন করে কোনো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পাওনা পরিশোধ করার উপায় বন্ধ হয়ে গেছে| একদিকে কোটি কোটি টাকার আমানত ব্যাংকে আটকে যাওয়া, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জালিয়াতির মাধ্যমে মূল তহবিল খালি করে দেওয়ার দ্বিমুখী চক্রান্তে পুরো অবসর ও কল্যাণ বোর্ড এখন চরম দেউলিয়াত্বের মুখে দাঁড়িয়েছে|
দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকেরা এখন দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তা আর হতাশার মধ্যে| অনেকেই পেনশনের আশায় দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ধরে অপেক্ষা করতে করতে অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন, অনেকেই পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে গিয়ে শেষ বয়সেও ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন| শিক্ষক সমাজের এই চোখের পানি আর আহাজারির কোনো জবাব দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ| শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নবগঠিত তদন্ত কমিটি হয়তো দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বের করে আনবে, কিন্তু ধ্বংসের মুখে পড়া এই কল্যাণ তহবিলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু তদন্ত কমিটি করাই যথেষ্ট নয়| বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিলম্বে পলাতক সাবেক সচিব ও তার চক্রের সদস্যদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হবে, বেসরকারি ব্যাংকে আটকে থাকা ৬৪০ কোটি টাকা দ্রুত আদায়ের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে এবং জাতীয় বাজেট থেকে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে হলেও এই ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের বকেয়া পাওনা দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, নতুবা জাতি হিসেবে শিক্ষাগুরুদের এই চরম অপমানের দায় আমরা কখনোই এড়াতে পারব না|
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category