• সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকা নৌকা থেকে উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশি, ১০ জনের মৃত্যু এক সাইট বন্ধ তো আরেক হাজির: ডিজিটাল জুয়ায় দিশেহারা প্রশাসন রূপালী ব্যাংকের ১৯১ কোটি টাকার অনাদায়ি: পাওনা মেটাতে বেক্সিমকোর ২৬ একর জমি নিলামে পাহাড়, সীমান্ত ও সমতল: বহুমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে দেশ সবুজ সনদের আড়ালে ফাঁদ: সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা পরিকল্পনাহীন বিদ্যুৎ নীতির মাশুল: দেশীয় গ্যাস হারিয়ে এলএনজির ফাঁদে অর্থনীতি সেলেনা গোমেজের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা পেশাদারিত্বের ঘাটতি না অজ্ঞতার মাশুল: ফিফার নিষেধাজ্ঞার জালে দেশের ফুটবল সংবিধান সংশোধন সংসদেই সম্ভব, রাজপথে বলে লাভ নেই : গয়েশ্বর

সবুজ সনদের আড়ালে ফাঁদ: সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের জাহাজভাঙা শিল্পে আবারও নেমে এসেছে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হংকং কনভেনশনের শর্ত মেনে পরিচালিত পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবে পরিচিত ফেরদৌস স্টিলে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৯ জন নিরীহ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর থেকে কারখানা কর্তৃপক্ষ এবং জাহাজ কাটার ছাড়পত্র প্রদানকারী বিভিন্ন সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে নিজেদের দায় এড়িয়ে একে অপরকে কাঠগড়ায় তোলার এক নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে স্ক্র্যাপ জাহাজটিকে ‘গ্যাস ও বিস্ফোরকমুক্ত’ বলে সনদ দিয়েছিল, তাদের তদারকিতে কী ধরনের চরম গলদ ছিল যার কারণে জীবন্ত মানুষগুলোকে বিষাক্ত গ্যাসে দম বন্ধ হয়ে মরতে হলো।
বাংলাদেশ গত বছর পরিবেশবান্ধব শিপ রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। নতুন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কেবল পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন সনদপ্রাপ্ত আধুনিক ইয়ার্ডগুলোরই পুরোনো জাহাজ আমদানি ও কাটার বৈধ এখতিয়ার রয়েছে। দেশে থাকা প্রায় দেড় শতাধিক স্ক্র্যাপ কারখানার মধ্যে যে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান এই ব্যয়বহুল রূপান্তর সম্পন্ন করেছিল, ফেরদৌস স্টিল ছিল তাদের অন্যতম। তবে কেবল পরিবেশবান্ধব তকমা পেলেই যে শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, তা এই দুর্ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডটির বিরুদ্ধে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী না দেওয়া, অতিরিক্ত কাজের মজুরি না দেওয়া এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন না করার অভিযোগে দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগেই শ্রম আদালতে নিয়মিত মামলা দায়ের করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। সেই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে স্ক্র্যাপ জাহাজ ‘এমটি রাসি’ কাটার সময় এই বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে।
৩০ হাজার টন ওজনের এই বিশালাকার জাহাজটি অতীতে আন্তর্জাতিক রুটে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো। চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে আসার পর বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় পরিদর্শন শেষে এটিকে কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ চলাকালে জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নির্ধারিত ‘ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাংক’ এলাকায় জমে থাকা অতিরিক্ত মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড নামক প্রাণঘাতী টক্সিক গ্যাসের নিঃসরণ ঘটে এবং ঘটনাস্থলেই কাজ করতে থাকা শ্রমিকরা সংজ্ঞাহীন হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
দুর্ঘটনার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বক্তব্য তাদের দায়িত্বহীনতার চিত্রকেই প্রকট করে তুলছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের কাজ কেবল জাহাজটিতে তেল ও গ্যাসের কারণে কোনো অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি আছে কি না তা যাচাই করে ছাড়পত্র দেওয়া। সেখানে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক বা টক্সিক উপাদানের ক্ষতিকর উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা তাঁদের নজরদারির আওতাভুক্ত নয়। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, তারা কেবল সামগ্রিক পরিবেশদূষণ মোকাবিলার নীতিগত ছাড়পত্র দেয়; ফলে কর্মক্ষেত্রের কারিগরি নিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নিরাপত্তা তদারকি সংস্থার। একইভাবে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরও জানিয়েছে, তারা শুধু শ্রমিকদের বুট, হেলমেট বা মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি দেখে, জাহাজের রাসায়নিক বিষাক্ততা পরীক্ষার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বা ম্যান্ডেট তাদের নেই।
সরকারি দপ্তরগুলোর এই পারস্পরিক দায়িত্ব ঠেলার সংস্কৃতি স্পষ্ট করে দেয় যে, আধুনিক গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ থাকার পরও মাঠপর্যায়ে তদারকির ক্ষেত্রে এক বিশাল শূন্যতা বিরাজ করছে। প্রতিটি সংস্থা তাদের আইনি ক্ষমতার নির্দিষ্ট গণ্ডি দেখিয়ে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে, যার নির্মম শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ শ্রমিকদের। বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার কার্যকারণ উদঘাটনে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিক সনদ প্রদান এবং বাস্তব তদারকির মধ্যে যে ফাঁক রয়েছে, তা বন্ধ করা না গেলে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ কেবল একটি ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডিং হিসেবেই থেকে যাবে এবং একের পর এক অনিরাপদ জাহাজের বিষাক্ত ফাঁদে ঝরবে মেহনতি মানুষের তাজা প্রাণ।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category