দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে একটি অদ্ভুত ও জটিল বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও সন্তোষজনক উন্নতি দেখা যাচ্ছে; কিন্তু ঠিক একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের কাঠামো এবং বিদেশের শ্রমবাজারে তৈরি হয়েছে নতুন কিছু গভীর উদ্বেগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে দেশে মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানি (এম২) ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অর্থের একটি বিশাল অংশ চলে যাচ্ছে সরকারি খাতে, যার ফলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহ মারাত্মকভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি আরও দ্রুতগতিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলেও বিদেশে নতুন কর্মীর কর্মসংস্থানের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এই মিশ্র চিত্র দেশের অর্থনীতির টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাস শেষে দেশে ব্রড মানি বা মোট মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২২ হাজার ৯৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ (২ লাখ ৫৫ হাজার ৪৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা)। মুদ্রা সরবরাহ বাড়লেও অভ্যন্তরীণ ঋণের বণ্টনে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। জুলাই শেষে মোট দেশীয় ঋণের পরিমাণ ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৮ কোটি ৬০ লাখ টাকায় উন্নীত হলেও, এর ভেতরে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দুর্বল। এক বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ের (৬ দশমিক ৫২ শতাংশ) তুলনায় অনেকটাই কম। বিপরীতে, সরকারি খাতে নিট ঋণ বৃদ্ধির হার এক লাফে ৩৪ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল মাত্র ১৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঋণযোগ্য অর্থের একটি বিশাল অংশ সরকার নিজেই নিয়ে নিচ্ছে, যার ফলে বেসরকারি খাতের শিল্প সম্প্রসারণ, উৎপাদন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব দেখা দিচ্ছে।
বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এক অদ্ভুত সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে রপ্তানি আয় ১৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেড়ে ৪৪১ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ১৭ দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়ে ৬১১ কোটি ৩৮ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, রপ্তানির তুলনায় আমদানি ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধুমাত্র আগস্ট মাসেই রপ্তানি ও আমদানির এই আর্থিক ব্যবধান প্রায় ১৬৯ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। তবে আশার কথা হলো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের বছরের তুলনায় অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। আগস্ট শেষে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৪২৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ বা ৬ দশমিক ২৬৮৬ বিলিয়ন ডলার বেশি।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে আগস্ট মাসে একটি ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যা জুলাই-আগস্ট মিলিয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। কিন্তু এই স্বস্তির বিপরীতে শ্রমবাজারে এক বড় ধাক্কা লেগেছে। ২০২৬ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া মানুষের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ বা ৭৬ হাজার ৯৪৬ জন কমে গেছে। বর্তমান রেমিট্যান্স মূলত অতীতে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের আয়ের ফল। তাই নতুন কর্মীর প্রবাহ যদি দীর্ঘমেয়াদে এভাবে কমতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডিজিটাল লেনদেনের প্রবণতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুলাই মাসে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৫১২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। আগস্টে কলমানি মার্কেটের ভারিত গড় ঋণের হার কমে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে নেমেছে, যা স্বল্পমেয়াদি অর্থবাজারে কিছুটা তারল্য স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়।
সামগ্রিকভাবে, অর্থনীতির বর্তমান চিত্রটি মিশ্র। রিজার্ভ, রেমিট্যান্স এবং ডিজিটাল লেনদেনের মতো সূচকগুলো শক্তিশালী হলেও সরকারি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণের খরা এবং শ্রমবাজারের পতন দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগামী মাসগুলোতে মুদ্রা সরবরাহের এই সুফল কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত