• সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন
Headline
পর্তুগাল–স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম দ্বৈরথ: কার জয়রথ চলবে কোয়ার্টার ফাইনালে মেয়ের বিয়ে: আমিন চাচার আট পরামর্শ পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল শুনানি মুলতবি প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ গুলশান লেকের পরিবেশ রক্ষা ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ : ডা. জুবাইদা রহমান অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্ততি ইসির ফিলিস্তিনকে সমর্থন করায় খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল: হুথি মুখপাত্র গাজার শাসনভার ছাড়ার ঘোষণা হামাসের সংসদহীন ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার লড়াই

সরকারি প্রচারণায় ব্যক্তিপূজা বন্ধের ঐতিহাসিক পরিপত্র

Reporter Name / ০ Time View
Update : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও চাটুকারিতার অভ্যাসে এক নজিরবিহীন বড় ধাক্কা এসেছে। রাষ্ট্রের যেকোনো ছোট-বড় বা প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সরকার প্রধানের ছবি ব্যবহার করে যে একধরনের তোষামোদি বা তেলবাজির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা চিরতরে বন্ধের কড়া নির্দেশ এসেছে শীর্ষ পর্যায় থেকে। গত রোববার সকালে গুলশানের নিজ বাসভবন থেকে সচিবালয়ের দিকে রওনা হওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চোখ আটকে যায় সড়কের পাশে টানানো একটি সরকারি মন্ত্রণালয়ের বিশাল ব্যানারে, যেখানে বড় বড় অক্ষরে শোভা পাচ্ছিল প্রধানমন্ত্রীর নিজেরই ছবি। দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এটি অত্যন্ত চেনা একটি সাধারণ দৃশ্য হলেও, সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে পা রেখেই প্রধানমন্ত্রী এক ঐতিহাসিক ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি অবিলম্বে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে তলব করে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দেন এবং এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি ঐতিহাসিক পরিপত্র জারি করা হয়। নতুন এই নীতিমালায় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এখন থেকে সরকারি কোনো অনুষ্ঠানের ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড বা প্রচারণামূলক উপাদানে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজের স্বাক্ষরে জারি করা এই বিশেষ পরিপত্রে মূলত তিনটি অত্যন্ত কড়া প্রশাসনিক নিয়ম সুনির্দিষ্টভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, সরকারি যেকোনো ধরনের কর্মসূচির ব্যানার, ফেস্টুন, ডিজিটাল স্ক্রিন বা বিলবোর্ডে থ্রিডি (3D) কিংবা অন্য কোনো আধুনিক বা বিশেষ আঙ্গিকেও প্রধানমন্ত্রীর ছবি কোনোভাবেই প্রদর্শন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, সরকারি যেকোনো প্রচারণামূলক উপকরণের মূল নকশা বা ডিজাইন এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন সেখানে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির চেয়ে ওই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য, মূল বার্তা এবং জনকল্যাণমূলক বিষয়বস্তু সর্বোচ্চ পরিমাণে প্রাধান্য পায়। এবং তৃতীয়ত, এই পরিপত্রটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে অবিলম্বে সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি দপ্তরে কার্যকর করার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিপূজার যে ঔপনিবেশিক ও সুবিধাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তার বিপরীতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত মূলত দেশের রাষ্ট্রকাঠামোতে তিনটি বড় এবং দূরদর্শী বার্তা বহন করে। প্রথম বার্তাটি হলো ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতির অবসান ঘটানো। বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে যেকোনো ছোট-বড় উন্নয়নমূলক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের ছবি ব্যবহার করে এক ধরনের কৃত্রিম স্তুতি বা চাটুকারিতার দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কড়া পরিপত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির গুণগানে বা সস্তা স্তুতিতে চলবে না, বরং রাষ্ট্র চলবে সম্পূর্ণ তার নিজের নিয়মে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তায়।

দ্বিতীয় বার্তাটি হলো, কাজের মূল বিষয়বস্তু ও জনগণের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকারি যেকোনো উন্নয়ন বা প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানের অর্থ মূলত সাধারণ জনগণের পকেট থেকে আসা ট্যাক্সের টাকা। একটি সরকারি আয়োজনে কোটি কোটি টাকা অপচয় করে রাজনৈতিক নেতার ছবি বড় করার চেয়ে সেই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য এবং জনগণের জন্য সেখানে ঠিক কী বার্তা, সুবিধা বা সেবা রয়েছে, সেটি সুস্পষ্ট হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি। নতুন এই নিয়মের ফলে এখন থেকে প্রতিটি সরকারি ব্যানারে ব্যক্তির বিশাল অবয়বের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের কাজ, সেবার বিবরণ ও বিষয়বস্তুই প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে।

তৃতীয় বড় বার্তাটি দেওয়া হয়েছে সরাসরি দেশের আমলাতন্ত্র ও সরকারি প্রশাসনের উদ্দেশ্যে। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সচিবালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক অনুগত বা বিশ্বস্ত প্রমাণ করার জন্য ব্যানারে নেতার বড় বড় ছবি ব্যবহার করতেন। এই নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে প্রশাসনকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হলো যে, ছবি টাঙিয়ে বা ব্যক্তিপর্যায়ে তেলবাজি করে নয়, বরং কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও মূল্যায়ন হবে কেবল তাদের পেশাগত কাজের দক্ষতা, সততা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। এটি আমলাতন্ত্রকে আরও বেশি প্রফেশনাল ও জনবান্ধব হতে বাধ্য করবে।

এই সিদ্ধান্তের আরেকটি বড় এবং ইতিবাচক দিক হলো রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি বিভিন্ন উৎসব বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণ কাপড়ের ব্যানারের চেয়ে অত্যন্ত খরচবহুল থ্রিডি বা ডিজিটাল এলইডি স্ক্রিন ও বিশাল বিলবোর্ড ব্যবহারের এক ক্ষতিকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। যেখানে জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেবল বিশাল আকারের আত্মপ্রচারণামূলক ও জাঁকজমকপূর্ণ ডিজাইন করা হতো। নতুন এই পরিপত্রে স্পষ্ট করে থ্রিডি বা অন্য যেকোনো ডিজিটাল আঙ্গিকে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করায় এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শনীবাদ ও অপচয় বন্ধ হবে। ফলে সরকারি প্রচারণার পেছনে যে বিশাল অঙ্কের বাজেট অপচয় হতো, তা এখন থেকে জনগণের প্রকৃত কল্যাণে এবং কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সরাসরি ব্যয় করা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের স্থানীয় বা মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে এক ধরনের ছবি প্রদর্শনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে আসছিল। যেকোনো ছোটখাট কালভার্ট, রাস্তা বা সরকারি ভবনের উদ্বোধন কিংবা সাধারণ কর্মসূচিতে স্থানীয় অসাধু কর্মকর্তা বা অতি উৎসাহী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জাহির করতে কিংবা ওপর মহলের সুনজরে আসতে বড় বড় তোরণ ও ব্যানার তৈরি করতেন। সেসব ব্যানারে সরকারের আসল উন্নয়ন প্রকল্পের তথ্যের চেয়ে নেতার ছবি অনেক বড় দেখাতো। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই তড়িৎ এবং কঠোর পরিপত্র মূলত সেই সুবিধাবাদী ও তোষামোদকারী মহলের সস্তা রাজনীতিতে একটি বড় ধাক্কা। এই পদক্ষেপ স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে সস্তা স্তুতি বা ছবির প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং কাজের স্বচ্ছতা, সততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করেই কেবল সাধারণ মানুষের প্রকৃত আস্থা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশে এই ধরনের কঠোর পরিপত্র জারি হওয়া নিঃসন্দেহে একটি সুস্থ, আধুনিক এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির শুভ সূচনা। তবে এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও অতি উৎসাহী নেতাকর্মীরা এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাটি বাস্তবে কতটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category