২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বহুল আলোচিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ এখন দূর থেকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিশ্বের আরেক পরাশক্তি—চীন। চীনের এই পর্যবেক্ষণ নিছক কোনো কৌতূহল নয়, বরং এটি তাদের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলের এক বিশাল মহড়া।
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর তার নীতি যেন নিউটনের তৃতীয় সূত্রের বিপরীত রূপ নিয়েছে।
কোভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা না করেই তিনি বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।
যারা আপত্তি জানিয়েছে, তাদের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ড কেনার অদ্ভুত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ডেনমার্ককে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন।
এমনকি, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ঘুমন্ত অবস্থায় সস্ত্রীক তুলে আনার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটিয়েছেন।
‘মিস্টার নাইস গায়’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সরাসরি ইরানকে টার্গেট করেছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের এই অতি-আগ্রাসী এবং অননুমেয় আচরণ চীনের জন্য এক বড় কেস স্টাডিতে পরিণত হয়েছে।
এই যুদ্ধ থেকে চীন সবচেয়ে বড় যে সামরিক শিক্ষাটি নিচ্ছে, তা হলো—‘নিউ জেনারেশন প্রযুক্তি’ বনাম ‘অসম যুদ্ধকৌশল’ (Asymmetric Warfare)।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে ব্যবহার করছে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ‘এফ-৩৫’ (F-35) যুদ্ধবিমান, ‘বি-২’ (B-2) স্টেলথ বোমারু বিমান এবং নিখুঁত লক্ষ্যভেদী গাইডেড বোমা। অন্যদিকে, ইরান বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশল:
সস্তা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল: ২০ হাজার ডলারের সাশ্রয়ী ড্রোন এবং স্বল্প প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা একসঙ্গে শত শত হামলা (Swarm attack) চালাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া: এই কৌশলের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক ‘প্যাট্রিয়ট’ (Patriot) এবং ‘থাড’ (THAAD)-এর মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো বিভ্রান্ত বা অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
চীনের সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ কেবল প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর করবে না; বরং তা নির্ভর করবে উৎপাদন সক্ষমতা, সামরিক কৌশল এবং গতির ওপর।
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে দেখছে ভবিষ্যতে ‘সম্ভাব্য তাইওয়ান যুদ্ধের প্রাক-অনুশীলন’ হিসেবে। তাইওয়ানকে চীন নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে এবং এই ইস্যুতে বিদেশি হস্তক্ষেপের পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হবে বলে বারবার সতর্ক করেছে। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে জাপানের অস্তিত্ব সংকটের কথা বললে বেইজিং কড়া ভাষায় তার সমালোচনা করে।
ইরানের ড্রোন কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোগান্তি দেখে চীন তাদের নিজেদের কৌশল সাজাচ্ছে। চীন ইতিমধ্যে হাইপারসনিক মিসাইল, দীর্ঘপাল্লার রকেট এবং জে-২০ (J-20) স্টেলথ যুদ্ধবিমানে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাইওয়ান যুদ্ধে চীনও একই ধরনের ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ (Drone Swarm) কৌশল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে।
চীনের সামরিক বাহিনীর একটি বড় দুর্বলতা হলো বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতার অভাব। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে সংঘাতের পর পিএলএ বড় কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো জায়গায় লড়াইয়ের বিশাল অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা থাকলেও ইরাক বা আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত রাজনৈতিক সাফল্য পায়নি।
ইরান যুদ্ধও সেই একই বাস্তবতার প্রমাণ দিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে হয়তো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে কৌশলগত সাফল্য পাওয়া যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্লেষক ক্রেইগ সিঙ্গেলটনের ভাষায়, “যুদ্ধক্ষেত্রে জয় মানেই রাজনৈতিকভাবে বিজয় নয়।”
বর্তমানের কোনো আঞ্চলিক সংঘাতই আর ‘আঞ্চলিক’ থাকে না। ইরান যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। অন্যদিকে, তাইওয়ান হলো বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। ভবিষ্যতে যদি তাইওয়ানকে ঘিরে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধে, তবে তা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি শিল্প ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বর্তমান সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াই নয়, এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা তৈরির এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার পড়তি সামরিক আধিপত্য ও ফুরিয়ে আসা অস্ত্রের মজুত নিয়ে লড়াই করছে, অন্যদিকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি দুর্বলতা এবং প্রতিটি ভুল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে।