দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সংকট লাঘব করার মহৎ উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যের সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারগুলো ঠিক কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে এবং এর প্রকৃত সুফল কারা ভোগ করছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে এক গভীর রহস্য ও অসন্তোষ বিরাজ করছে | আন্তর্জাতিক বাজারের লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি এবং নানামুখী অর্থনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে যেখানে বাজারে বেসরকারি এলপিজির সাড়ে বারো কেজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এক হাজার এক শ তেরো টাকা বা তারও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান ‘এলপি গ্যাস লিমিটেড’-এর উৎপাদিত সমপরিমাণ ও ওজনের একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য মাত্র সাত শ ছিয়াত্তর টাকা ও নব্বই পয়সা | কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সাধারণ ভোক্তাদের হাতের নাগালের এই বিপুল পরিমাণ সুলভ মূল্যের জ্বালানি সিলিন্ডার কদাচিৎই সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছায়, বরং এর বড় একটি অংশ অদৃশ্য হয়ে কালোবাজারি এবং সিন্ডিকেটের কবলে চলে যায় |
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে যে, সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির এই বিশাল মূল্যের ফারাকের কারণে বাজারে এক ধরনের চরম বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে | কাগজে-কলমে সরকারি কোম্পানির গ্যাসের দাম কম হলেও বাস্তবে সাধারণ ক্রেতাদের বাজারে গিয়ে বেসরকারি সিলিন্ডারের চড়া দাম অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার চার শ টাকা পর্যন্ত গুনতে বাধ্য হতে হয় | এর ফলে সমাজের অতি সীমিত আয়ের মানুষ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারি কম দামি এলপিজির সুফল থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে | অন্যদিকে, নামমাত্র মূল্যের সরকারি সিলিন্ডারগুলো বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটি বিশেষ চক্র বা ডিলার সিন্ডিকেটের হাত বদল হয়ে ভিন্ন খাতে চলে যায়, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যের এই গ্যাস কেবল একটি কল্পকাহিনির মতোই থেকে যায় |
সরকার নিয়ন্ত্রিত এই সরকারি এলপিজির সরবরাহ সংকটের মূল কারণ নিহিত রয়েছে উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক চাহিদার মধ্যকার আকাশ-পাতাল ব্যবধানে | বর্তমানে সারা দেশে এলপিজির মাসিক চাহিদা আনুমানিক এক লক্ষ ত্রিশ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে, যার দৈনিক পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার টন | অথচ এর বিপরীতে একমাত্র সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলপি গ্যাস লিমিটেড’-এর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা মোটে পনেরো থেকে কুড়ি হাজার টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ | সহজ হিসাবে বলা চলে, সরকারি এই গ্যাস দিয়ে দেশের মোট বার্ষিক চাহিদার মাত্র এক দশমিক তিন শতাংশ বা বড় জোর সারা দেশের তিন থেকে পাঁচ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে | এই নগণ্য পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দেশের বিশাল বাজারে কোনো স্থায়ী প্রভাব ফেলা সম্ভব নয়, আর এই সীমিত সরবরাহের সুযোগ নিয়েই একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার সিন্ডিকেট ফায়দা লুটে নিচ্ছে |
সরকারি বিপণন কোম্পানিগুলোর তালিকাভুক্ত ডিলারদের বিতরণ কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে ভয়াবহ অনিয়ম ও শৃঙ্খলাহীনতার চিত্র বেরিয়ে আসে | পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিনটি রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন কোম্পানির মাধ্যমে সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারগুলো মাঠপর্যায়ে ডিলারদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয় | কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই ডিলার নিয়োগ বা কোটা বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের স্বচ্ছ নীতিমালা বা সুনির্দিষ্ট অগ্রাধিকারের বালাই নেই | উদাহরণস্বরূপ, গত ৫ আগস্টের বিক্রয় তথ্য খতিয়ে দেখা গেলে দেখা যায় যে, সিলেটের একজন নির্দিষ্ট ডিলারকে একদিনেই এক হাজার আট শ সিলিন্ডার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ একই দিনে পার্শ্ববর্তী অন্য ডিলাররা মাত্র দশ বা পনেরোটি সিলিন্ডার পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হয়েছেন | ডিলারভেদে বরাদ্দের এই পাহাড়সম বৈষম্যের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা জবাব বিপণন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাওয়া যায় না |
ডিলারদের লাইসেন্স ও ব্যবসার ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি ডিলারকে ন্যূনতম পাঁচটি করে সিলিন্ডার দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি সিলিন্ডার প্রভাবশালী চক্রের হাতে কুক্ষিগত হয় | রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, মাসজুড়ে তার ভাগে মোটে সত্তরটির মতো সিলিন্ডার জোটে, যার বেশ কয়েকটিতে আবার ত্রুটি বা লিকেজ থাকে | গ্যাস লিক করার কারণে সাধারণ গৃহিণীরা এই সিলিন্ডারগুলো নিতে চান না, ফলে বাধ্য হয়ে এসব ত্রুটিপূর্ণ ও নামমাত্র মূল্যের সরকারি সিলিন্ডারগুলো হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দিতে হয় | অন্যদিকে নারায়নগঞ্জের এক ডিলারের ভাষ্যমতে, মাসের পর মাস ঘুরে সামান্য কিছু সিলিন্ডার হাতে পেলেও তার গুণগত মান নিয়ে গ্রাহকদের মনে তীব্র অসন্তোষ রয়েছে | মোহাম্মদপুরের সাধারণ চাকরিজীবী শাহ আলম আক্ষেপ করে বলেছেন যে, সরকারি সুলভ এলপিজির নাম শুধু শুনেছেন কখনো নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি |
এই অনিয়মের সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটি হলো তথাকথিত ‘ক্রস ফিলিং’ বা অবৈধ উপায়ে সিলিন্ডার পরিবর্তনের কারসাজি | অভিযোগ রয়েছে যে, অসাধু ডিলার ও ব্যবসায়ীরা কম দামি সরকারি সিলিন্ডারগুলো থেকে গ্যাস কেটে বা ট্রান্সফার করে অধিক মুনাফার লোভে বেসরকারি কোম্পানির ফাঁকা সিলিন্ডারে ভরে বাজারে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করে দেয় | এর ফলে একদিকে যেমন সরকারি সিলিন্ডারের গায়ে লেখা নির্ধারিত মূল্যের চরম লঙ্ঘন ঘটে, অন্যদিকে সাধারণ ক্রেতারা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন | এলপি গ্যাস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ স্বীকার করেছেন যে, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড বা ইআরএল থেকে কাঁচামাল বা গ্যাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে | তবে ইআরএলের সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও সরকারি কোম্পানির পক্ষে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে অন্তত আরও দুই বছর সময় লাগবে বলে তিনি মনে করেন |
এদিকে সরকারি গ্যাস কালোবাজারির শিকার হওয়ার বিষয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও চিঠি পাঠিয়েছে এলপি গ্যাস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ | বিপণন কোম্পানির তথ্য মতে, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটসহ কিছু নির্দিষ্ট সরকারি সংস্থাকে রেশনের মাধ্যমে এই গ্যাসের একটি বড় অংশ নিয়মমাফিক সরবরাহ করা হলেও বাকি অংশ ডিলারদের মাধ্যমে খোলা বাজারে ছাড়া হয়, যেখানেই মূলত গলদ ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় | এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বেসরকারি এলপিজি আমদানিকারক ও পরিবেশকরা বিইআরসির কাছে তাদের নিজস্ব ব্যবসার লাইসেন্স ফি, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য খরচের অজুহাত দেখিয়ে মুনাফার কমিশন দুই থেকে আড়াই গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করেছে | রাজধানী বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা তাদের কমিশন বাড়ানোর পক্ষে নানা জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করলেও ভোক্তারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন |
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত কঠোর মন্তব্য করেছেন | তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, কেবল পণ্যের দাম বাড়িয়ে বা ব্যবসায়ীদের কমিশন পুনর্বিন্যাস করে এই দীর্ঘমেয়াদী অনিয়ম ঠেকানো সম্ভব নয় | সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই সীমিত ও সুলভ সরকারি এলপিজি সম্পূর্ণভাবে খোলা বাজারের লুণ্ঠন থেকে রক্ষা করে দেশের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার, এতিমখানা ও প্রান্তিক জনপদের রান্নার কাজে সুনির্দিষ্ট কোটার মাধ্যমে ব্যবহার করা যেত | কিন্তু তদারকি ও সদিচ্ছার চরম অভাবে আজ এই জনকল্যাণমূলক জ্বালানি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে | পরিশেষে বলা যায়, সরকারের নীতিগত দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাবেই সুলভ সরকারি গ্যাস আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যা রোধ করতে অবিলম্বে কঠোর ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জবাবদিহিমূলক বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে |
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা