মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির খোলা বা স্পট মার্কেট কার্যত গুটিকয়েক বহুজাতিক ট্রেডারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে| বিগত ছয় মাসে স্পট মার্কেট থেকে কেনা ৩৪টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে ৩১টিই সরবরাহ করেছে মাত্র পাঁচটি নির্দিষ্ট কোম্পানি| আন্তর্জাতিক মানদণ্ড জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকের চেয়ে অস্বাভাবিক বাড়তি দর হাঁকিয়ে বিলিয়ন ডলারের এই বাজারকে জিম্মি করে ফেলেছে চক্রটি| প্রতিযোগিতাহীন এই কেনাকাটায় প্রতি কার্গোতে বাংলাদেশকে ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে| এই বিপুল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ ঠেকাতে এবং স্পটের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকার এখন স্পট কেনাকাটা নিরুৎসাহিত করে একাধিক নতুন সরবরাহকারীর সাথে স্বল্পমেয়াদি আনুষ্ঠানিক চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করার পথে হাঁটছে|
পেট্রোবাংলার তথ্য ও বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে খোলাবাজার থেকে মোট ৩৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করেছে বাংলাদেশ| এর মধ্যে টোটাল এনার্জিস একাই সর্বোচ্চ ৯টি, বিপি সিঙ্গাপুর ৭টি, আরামকো ট্রেডিং ৬টি, ভিটল এশিয়া ৫টি এবং পসকো ইন্টারন্যাশনাল ৪টি কার্গো সরবরাহ করেছে| বাকি তিনটি কার্গোর মধ্যে গানভর সিঙ্গাপুর দুটি এবং বিজিএন ইন্টারন্যাশনাল একটি সরবরাহ করে| অর্থাৎ পুরো আমদানির ৯১ শতাংশের বেশি চলে গেছে প্রথম পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পকেটে| চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও স্পট মার্কেট মিলিয়ে এলএনজি আমদানি বাবদ দেশকে পরিশোধ করতে হয়েছে ২৬৭ কোটি ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ২২৬ মার্কিন ডলার|
কাগজে-কলমে স্পট মার্কেট থেকে কার্গো সরবরাহের জন্য পেট্রোবাংলায় ২৯টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত থাকলেও দরপত্র আহ্বানের পর মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি কোম্পানি প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়| সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই নিজস্ব উৎস থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহের লজিস্টিক সক্ষমতা নেই| এর পাশাপাশি অতীতে ডলার সংকট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময়মতো বিল না পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও অনেক প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকে দরপত্র থেকে দূরে রাখছে| যেমন ২০২৩ সালে কার্গো সরবরাহ করে দীর্ঘ সময় বিল না পাওয়ার কারণে জাপানের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান জেরা দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল| প্রতিযোগিতার এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে সক্রিয় স্বল্পসংখ্যক ট্রেডার সিন্ডিকেট তৈরি করে জেকেএম সূচকের চেয়ে প্রতি ইউনিটে এক থেকে দুই ডলার পর্যন্ত বাড়তি প্রিমিয়াম দাবি করছে|
এই সিন্ডিকেটের মুনাফালোভী প্রবণতা সাম্প্রতিক কিছু কেনাকাটার দরে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে| আগামী ২৫-২৬ সেপ্টেম্বরের আমদানির জন্য স্পট দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিটের জন্য দর প্রস্তাব করে ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার, অথচ ওই সময়ে আন্তর্জাতিক জেকেএম মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ০৯ ডলার| অর্থাৎ সূচকের চেয়ে প্রায় সাড়ে তিন ডলার বেশি চাওয়ায় মাত্র একটি কার্গোতেই সরকারকে অতিরিক্ত ৯০ লাখ ডলারের বেশি গচ্চা দিতে বাধ্য হতে হয়েছে| একইভাবে ৫-৬ অক্টোবরের সরবরাহের জন্য ভিটল এশিয়া প্রতি ইউনিটে ২৬ দশমিক ৬৬ ডলার দর দেয়, যেখানে জেকেএম দর ছিল প্রায় ২৫ ডলার| বাজারদরের সঙ্গে এমন আকাশ-পাতাল অসঙ্গতির কারণে গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অক্টোবরের জন্য প্রস্তাবিত দুটি কার্গোর ক্রয়প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দেয়|
স্পট মার্কেটের এই অনৈতিক কারসাজি রুখতে সরকার এখন কৌশলী অবস্থান নিয়েছে| পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে টোটাল এনার্জিস জেকেএম-এর চেয়ে দুই ডলার বাড়তি চাইলেও, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীনে মাত্র ৬ সেন্ট প্রিমিয়ামে বাংলাদেশকে ১৮টি কার্গো সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে| এই বিশাল আর্থিক সাশ্রয় নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দিয়েছে| বর্তমানে কাতার এনার্জি, ওকিউ ট্রেডিং, এক্সিলারেট এনার্জি এবং আরামকোসহ সাতটি কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি আনুষ্ঠানিক চুক্তি বলবৎ রয়েছে| এর বাইরে স্পটের ওপর নির্ভরতা কমাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইআরএস, সুইজারল্যান্ডের ট্রাফিগুরা, বিপি, অস্ট্রেলিয়ার উডসাইড এনার্জি এবং জাপানের জেরার সঙ্গে আগামী জুন পর্যন্ত নতুন করে স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, জাতীয় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো অবস্থাতেই যেন স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস কেনা না হয়| তবে হরমুজ প্রণালির চলমান উত্তেজনায় কাতার ও ওমান তাদের নিয়মিত চুক্তি অনুযায়ী কার্গো পাঠাতে পারবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগও বজায় রয়েছে|
এদিকে দীর্ঘ দেড় মাসের গ্যাস সংকটের পর জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে যাচ্ছে| আজ সোমবার রাত বা আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ আরও ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়াতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা| আগামী ২০ থেকে ২৫ দিনের এলএনজি আমদানির শিডিউল নিশ্চিত হওয়ায় সংস্থাটি এই বাড়তি গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে আগ্রহী| আগামীকাল রাতে পসকোর একটি কার্গো এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে পৌঁছানোর কথা রয়েছে| এছাড়া অক্টোবরের মোট চাহিদার ১০টি কার্গোর মধ্যে এরই মধ্যে ৬টির সংস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে| বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে ২৩৫ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল থেকে আসছে ৭০ কোটি ঘনফুট| নতুন কার্গো যুক্ত হলে মোট সরবরাহ ২৫০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে|
তবে বাড়তি এই গ্যাস শিল্পকারখানায় যাবে নাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রে, তা নিয়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মধ্যে নতুন দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে| ভারতের আদানি পাওয়ার এবং দেশীয় আরএনপিএল-এর দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ইউনিট যান্ত্রিক কারণে বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) লোডশেডিং সামাল দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে| বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও পিডিবি তা বাড়িয়ে ১০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার জোরালো দাবি ও তদবির শুরু করেছে| গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে যে গ্যাস বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, ৬ আগস্ট টার্মিনাল সচল হওয়ার পরও মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সময়মতো কার্গো না পাওয়ার কারণেই এত দিন দীর্ঘায়িত হয়েছে| নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—বিদ্যুৎ ও শিল্প উভয় খাতের ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে স্পট সিন্ডিকেটের হাত থেকে বের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়|