• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৮:২০ পূর্বাহ্ন
Headline
মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো শিরোনাম: আসিফ মাহমুদকে কটাক্ষ করে নীলার স্ট্যাটাস: ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’ ‘ইরান চুক্তি চায়, তবে আমি সন্তুষ্ট নই’—ট্রাম্প; অন্যদিকে হুমকি বন্ধের শর্তে কূটনীতিতে আগ্রহী তেহরান বাংলাদেশে হামে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা: অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা

স্বাধীনতাবিরোধী’ তকমা এখন রাষ্ট্রের নথিতে: কী করবে জামায়াত?

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

“আওয়ামী লীগ যা করতে পারেনি, বিএনপি তাই করে দেখাল।”—বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এটিই সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। এতদিন যে জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা ও আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বা ‘অপরাধী সংগঠন’ বলে আখ্যা দেওয়া হতো, এবার রাষ্ট্রীয় আইনেই সেই তকমা স্থায়ীভাবে খোদাই করে দিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল ২০২৬’-এর মাধ্যমে জামায়াতকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে সিলমোহর দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো, সংসদে এই বিল পাসের সময় জামায়াতে ইসলামী জোরালো কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি তাদের বর্তমান রাজনৈতিক মিত্র ‘এনসিপি’-ও এই বিলে সমর্থন জুগিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, জোরালো বিরোধিতা না করে জামায়াত কার্যত নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে মেনেই নিয়েছে। আসলেই কি জামায়াত ইতিহাসকে মেনে নিল, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রাজনৈতিক কৌশল?

বিল পাসের নেপথ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ঘটনার সূত্রপাত গত ৯ এপ্রিল। ওইদিন জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সংশোধন বিল ২০২৬’ উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান। সংশোধিত এই আইনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের পাশাপাশি স্পষ্টভাবে নাম রয়েছে ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র। কণ্ঠভোটে যখন বিলটি পাস হয়, তখন সংসদে এক অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সরকারের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক চাল ও ‘নীরবতা’ তত্ত্ব

সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো বিল পাসের সময় তার ওপর সংশোধনী প্রস্তাব আনা বা তীব্র বিরোধিতা করা বিরোধী দলগুলোর সাধারণ রীতি। কিন্তু ৯ এপ্রিল বিলটি পাসের সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জোরালো অবস্থান দেখা যায়নি। সরকার এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে।

গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান তার বক্তব্যে এই জল্পনাকে আরও উসকে দেন। তিনি বলেন, যেহেতু সংসদে বিলটি উত্থাপন ও পাসের সময় জামায়াত তেমন কোনো জোরালো অবস্থান নেয়নি বা সংশোধনী প্রস্তাব আনেনি, তাই তারা কার্যত নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী চরিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখানে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী চাল চেলেছে। বিলের সংজ্ঞায় জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে স্পষ্ট করে লিখে দেওয়ার পর সরকারের যুক্তি হলো—”আমরা তো আইনেই লিখে দিয়েছি তোমরা কারা, আর তোমরা তো তাতে বাধা দাওনি; তার মানে বিষয়টি তোমরা মেনেই নিয়েছো।”

জামায়াতের অবস্থান: ‘ফ্যাসিবাদী বয়ান’ বনাম আত্মরক্ষা

সরকারের এই ব্যাখ্যার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই বিলটিকে একটি ‘ফ্যাসিবাদী বয়ান’ বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের দাবি, সংসদে তারা আপত্তি জানালেও সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করেছে। তাদের প্রশ্ন—”আমরা আপত্তি জানালাম, কিন্তু তা তো ধোপে টিকল না। তাহলে আমাদের কী করার ছিল?”

জামায়াত মূলত বর্তমান রাজনীতিতে তাদের নতুন রূপ ও জনসমর্থনকে সামনে আনতে চাইছে। নিজেদেরকে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। দলটির মতে, ১৯৭১ সালের সেই পুরনো প্রসঙ্গ টেনে এনে সরকার আসলে বর্তমানের রাজনীতিতে তাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, জামায়াত এই ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ তকমা মনেপ্রাণে মানছে না, বরং বিষয়টিকে একটি মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আসল ঝুঁকি: রাজনৈতিক বিতর্ক এখন ‘আইনি বাস্তবতা’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গাটি হলো এই বিলের ‘আইনি বৈধতা’। এতদিন ধরে জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী বলাটা মূলত রাজনৈতিক বাগবিতণ্ডা বা বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এই বিল পাসের মাধ্যমে তা এখন একটি নিরেট আইনি বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় নথির অংশে পরিণত হলো।

রাষ্ট্রের নথিতে যেহেতু জামায়াতে ইসলামীর নাম ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে খোদাই করা হয়েছে, ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার চাইলে সংবিধান বা অন্যান্য কঠোর আইনি ধারার মাধ্যমে দলটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের পদক্ষেপ (এমনকি নিষিদ্ধকরণ) নিতে পারে। জামায়াত মুখে বিষয়টি স্বীকার করুক বা না করুক, রাষ্ট্র এখন তাদের আইনিভাবে এমন এক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়া তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।

আগামীর রাজনীতি: অদৃশ্য শিকল নাকি নতুন লড়াই?

পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, এই বিল পাসের মাধ্যমে তারেক রহমানের সরকার একটি ঐতিহাসিক অবস্থান পরিষ্কার করেছে। অন্যদিকে জামায়াত এখন আইনি লড়াইয়ের চেয়ে রাজপথের জনমতের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। অতীতের দায়বদ্ধতাকে বর্তমানের জনসমর্থন দিয়ে চাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে দলটি।

তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সরকার কি সত্যিই কোনো আইনি পথে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দিকে এগোচ্ছে, নাকি এটি কেবলই রাজনৈতিক চাপ ও আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন।

বিলটি পাস হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে জামায়াতের রাজনীতি আজই শেষ হয়ে গেল। বরং এটি তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া এমন এক ‘অদৃশ্য শিকল’, যা ভবিষ্যতে তাদের প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করবে। জামায়াতের এই কৌশলগত নীরবতা কি সত্যিই তাদের আত্মরক্ষার উপায়, নাকি উদ্ভূত পরিস্থিতির কাছে নিরুপায় আত্মসমর্পণ—তা হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই পরিষ্কার হবে। তবে একটি বিষয় একেবারেই ধ্রুব সত্য, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭১ সাল এবং মুক্তিযুদ্ধকে উপেক্ষা করে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category