মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এক চরম অনিশ্চিত মোড় নিয়েছে| ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করার পর এবার বাব আল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত পেরিম দ্বীপ দখল করেছে ইরানপন্থী শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা| পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পর আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই লাইফলাইনে হুতিদের সামরিক উপস্থিতি বিশ্ববাজারে নতুন করে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে| লোহিত সাগরের উপকূলীয় বন্দরগুলো থেকে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির প্রধান প্রবেশদ্বার এই বাব আল-মান্দেব| হুতিদের এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে|
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা পেরিম দ্বীপে হুতি যোদ্ধাদের প্রবেশের তথ্য স্বীকার করেছেন| এর আগে সরকারের কর্মকর্তারা জানান, পেরিম দ্বীপের ঠিক মুখোমুখি অবস্থিত ধুবাব শহরের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায় এবং সেখানকার সামরিক ঘাঁটি থেকে সরকারি সেনাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়| এর ঠিক আগের দিন বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের অন্যতম প্রধান উপকূলীয় বন্দরনগরী মোখার নিয়ন্ত্রণও গ্রহণ করে হুতিরা| উল্লেখ্য, সৌদি আরবের পশ্চিম প্রান্তে থাকা লোহিত সাগর থেকে সরাসরি আরব সাগরে পৌঁছানোর একমাত্র সমুদ্রপথ হলো বাব আল-মান্দেব| এটি মূলত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবহনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিকল্প রুট হিসেবে কাজ করে আসছিল|
আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি বাণিজ্যের মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি জলপথ—হরমুজ প্রণালি, সুয়েজ খাল এবং বাব আল-মান্দেব বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত| স্বাভাবিক সময়ে কেবল হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয় বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের ২৭ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ২০ শতাংশ| অন্যদিকে সুয়েজ খাল দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ এবং এলএনজি বাণিজ্যের অন্তত ৮ শতাংশ পণ্য পরিবহন সম্পন্ন হয়| আর বাব আল-মান্দেব দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় ১১ শতাংশ এবং এলএনজির ৮ শতাংশ পরিবাহিত হয়| ফলে হরমুজের অনিশ্চয়তার মধ্যে বাব আল-মান্দেবে হুতিদের একচ্ছত্র সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান দুটি ধমনি একযোগে অচল হয়ে পড়া|
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি রুদ্ধ থাকায় সৌদি আরব নিজেদের উৎপাদিত জ্বালানি তেল লোহিত সাগরের বন্দর থেকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে রফতানি করার পরিকল্পনা করছিল| কিন্তু সেখানে হুতিদের দখলদারত্ব স্থায়ী হলে সবচেয়ে মারাত্মক ও সরাসরি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে রিয়াদ| যদিও বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, হুতিরা এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে বাব আল-মান্দেব শুধু সৌদি আরবের জাহাজ ছাড়া অন্য সবার জন্য উন্মুক্ত ও সম্পূর্ণ নিরাপদ| আল জাজিরা জানিয়েছে, হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি স্পষ্ট শর্ত জুড়ে দিয়ে বলেছেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরব তাদের দীর্ঘদিনের অবরোধ প্রত্যাহার করলেই কেবল তাদের তেলবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবে এই পথ দিয়ে চলতে দেওয়া হবে| কিন্তু এই আশ্বাসের পরও বৈশ্বিক শিপিং ও বিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, কারণ অতীতে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার তিক্ত অভিজ্ঞতায় ওই পথে নৌচলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গিয়েছিল|
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান যুদ্ধাবস্থা| হরমুজ প্রণালি বন্ধের পেছনে থাকা সামরিক সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির তীব্র চাপে রয়েছে| ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধে হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবে উত্তেজনা আখেরে তেহরানের কৌশলগত দরকষাকষির সক্ষমতাকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা| হরমুজ ও লোহিত সাগরের অনিশ্চয়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের দাম এক লাফে অনেকটাই বেড়ে গেছে| সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাজারে ডিজেলের গড় মূল্য গ্যালনপ্রতি প্রায় ৬ দশমিক শূন্য ৬ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে|
এর সরাসরি উত্তাপ আছড়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের খোলা বাজারে| ইরান যুদ্ধের জেরে বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার অতিক্রম করে| গতকাল সামান্য সংশোধন এলেও সামগ্রিক বাজার এখনো চরম অস্থির| সিএনবিসি নিউজ জানায়, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ২১ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার নির্দেশক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৯৯ দশমিক শূন্য ৮ ডলারে লেনদেন হয়েছে|
এই বহুমুখী সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার স্পষ্ট পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ)| সংস্থাটি গতকাল এক পর্যালোচনায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সামগ্রিক সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই পূর্বের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেকটাই হ্রাস পেতে পারে| মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত স্বাভাবিক সরবরাহ চেইনকে এমনভাবে ভেঙে দিচ্ছে যে, এই আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে| সার্বিকভাবে, হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবে হুতিদের এই অগ্রযাত্রা কেবল আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এক দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অন্ধকার ইঙ্গিত দিচ্ছে|