• বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

হর্ন ইফেক্ট: ভুল ধারণার মাতৃগর্ভ

বাদল সৈয়দ / ১ Time View
Update : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬

(পুরোটা না পড়লে বিভ্রান্ত হতে পারেন)
১ )বিভ্রান্তি পর্ব-
১৯৮৪ সাল । কুমিল্লায় বড়মামার বাড়ি গিয়েছি। তিনি সেখানে একটি ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান ছিলেন। কয়েকদিন খুব মজা করলাম। তারপর একদিন সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় তিনি কঠিন কণ্ঠে বললেন- ‘তোর পড়াশোনা নাই? আজই চিটাগাং চলে যাবি। অফিস থেকে এসে যেন তোকে না দেখি।‘
মামি খুব বিব্রত হয়ে বললেন- ‘থাকুক না আর কয়দিন।‘
মামা আরো রেগে গিয়ে বললেন- ‘নো। অনেক বেড়ানো হয়েছে। এবার চলে যাক।‘
২) ১৯৯০ সাল
বড়মামা তখন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। অফিস থেকে তাঁকে দুটো জীপ দেওয়া হয়েছিল। একদিন আমাদের শখ হলো পতেঙ্গা সি বিচে যাব। মামাকে বললাম- ‘আমাদের কি বিকেলে বিচে যাওয়ার জন্য একটি গাড়ি দেওয়া যায়?’
তিনি রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন- ‘তুই কি রাজার ছেলে নাকি যে বিচে যেতে গাড়ি লাগবে?
মামার আচরণ জেনে নিশ্চয় আপনার তাঁর উপর খুব রাগ হচ্ছে। ভাবছেন তাঁর মতো বাজে লোক আর হয় না। এভাবে কিশোর ভাগ্নেকে কেউ বাড়ি থেকে বের করে দেয়? কিংবা এভাবে গাড়ি চাওয়ার আবদার ফিরিয়ে দেয়?
তাহলে আরো দুটি ঘটনা বলি।
২) মায়া পর্ব
ক) ১৯৭২ বা ৭৩ সাল।
আমার বয়স তখন চার-পাঁচ।
গ্রামে নানা বাড়ি গিয়েছি। সেখানে প্রচণ্ড জ্বর এলো। আব্বা- আম্মা, নানা-নানি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। স্থানীয় ডাক্তার দেখানো হলো, কিন্তু জ্বর কমল না। পরে শুনেছি, আমি নাকি জ্বরের ঘোরে বারবার বকছিলাম- ‘বড় মামা, বড় মামা…।‘
বড়মামা তখন থাকতেন চট্টগ্রাম শহরে। তখন সেখান থেকে পটিয়া আসা-যাওয়া সহজ ছিল না।
কিন্তু রাতে জ্বরের ঘোরে আমি দেখলাম একটি ছায়া আমার সামনে ঝুঁকে আছে। তার হাতে নীল একটি সোয়েটার। আমার চোখের সামনে সোয়েটারটি দোল খাচ্ছে, আর ছায়াটি হাসছে। একটু পর ঘোর কমতেই দেখলাম বড়মামার মুখ, তাতে গভীর আদর! তিনি হাসতে হাসতে বলছেন-‘ আমি এসেছি। দ্যাখ কী সুন্দর সোয়েটার তোর জন্য এনেছি।‘
পরে শুনলাম, আব্বা আমার অস্থিরতা দেখে মামাকে ট্রাংক কল করে খবর দিয়েছিলেন। মামা অফিস থেকেই মোটর সাইকেল চালিয়ে সোজা পটিয়ায় হাজির! পথে নিউমার্কেটে নেমে সোয়েটারটি কিনেছিলেন।
মামার দেওয়া নীল সোয়েটারটি আমার এত প্রিয় ছিল যে, এমনকি তীব্র গরমেও কোথাও বেড়াতে গেলে আমি সেটা পরতাম। শত মানা করলেও শুনতাম না।
খ) সম্ভবত ১৯৭৪ সাল।
তখন চট্টগ্রাম শহরে হাতেগোনা কয়েকটি গাড়ি চলত। আমরা অবাক বিস্ময়ে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, কারা এসব গাড়িতে চরে?
একদিন দুপুরে দেখি আমাদের কলোনির বাসার সামনে একটি চকচকে ভক্সওয়াগন গাড়ি এসে থামল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছি, এত সুন্দর গাড়ি নিয়ে কে এলো? ও মা! অবাক হয়ে দেখি গাড়ি থেকে নামছেন বড়মামা!
তিনি বাসায় ঢুকে আমাকে কোলে নিয়ে বললেন- ‘মোটরসাইকেল বাদ দিয়েছি। নতুন গাড়ি কিনেছি। চল তোদের ঘুরিয়ে আনি।’
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে আমরা সব ভাইবোন নিচে নেমে এলাম। তারপর গাদাগাদি করে সেই নতুন গাড়িতে করে পতেঙ্গা। মামা আমাদের সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাচ্ছেন।
৩) হর্ন ইফেক্ট পর্ব
নিশ্চয় ভাবছেন, এত চমৎকার মামা প্রথমে বর্ণিত ঘটনাগুলোতে এত খারাপ ব্যবহার করেছিলেন কেন?
কারণ আছে-
তাঁর বাসা থেকে আমাকে ভাগিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ আব্বা তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন, আমি কলেজে না গিয়ে তাঁর বাসায় পড়ে আছি। এতে তাঁর মেজাজ আকাশে উঠেছিল।
বিচে যেতে গাড়ি দেননি কারণ তিনি অফিসের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন না। তাই আমার আবদার শুনে খেপে গিয়েছিলেন। আমার জায়গায় তাঁর ছেলে রায়হান বা বোরহান আবদার করলেও তিনি একই কথা বলতেন।
বড়মামা সম্পর্কে পুরো না জেনে তাঁকে কেবল দুটো আচরণ দিয়ে বিচার করলে মনে হবে তাঁর মতো খারাপ মানুষ আর দুটো নেই।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাই হচ্ছে হর্ন ইফেক্ট (Horn Effect)
এর অর্থ হচ্ছে-
কোনো মানুষের একটি নেতিবাচক আচরণ বা বৈশিষ্ট্য দেখে তাঁর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা করা। অনেকটা মলাট দেখে বই বিচার করার মতো।
যেমন, আমার বড়মামা হচ্ছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মামা। তাঁর হৃদয়ে ছিল মমতার সমুদ্র। অথচ পরের গল্পগুলো না বললে আপনার মনে হতো তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মামা।
আমরা কমবেশি সবাই হর্ন ইফেক্টে ভুগি। এটি কাটিয়ে ওঠা খুব জরুরি। কারণ এই ভুলের কারণে আমরা প্রকৃত মানুষ চিনতে ভুল করি। যে মানুষগুলো হীরা, তাদের পাথর ভেবে অগ্রাহ্য করি। অথচ এদের আবিষ্কার করতে পারলে তাঁরাই আমাদের জীবনের সেরা পথ প্রদর্শক হতে পারেন।
কাউকে বিচার করতে হলে তার ব্যাপারে পুরোপুরি জানতে হবে।
৪ ) স্মৃতি পর্ব
কয়েকদিন আগে আমার বন্ধু তারেক জুয়েলে বাসায় গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে দেখি তাঁর বাংলোর সামনে একটি অতি পুরোনো ভক্সওয়াগন দাঁড়ানো। গাড়িটি অবিকল বড়মামার ভক্সওয়াগনের মতো। আমি থমকে গিয়ে সেটিতে হাত বুলাচ্ছি। আমার চোখে ভাসছে অলৌকিক বাগানের বাসিন্দা বড়মামার চেহারা।
তারেক বললেন-‘খুলনার এক ভদ্রলোক থেকে কিনেছি। খুব সুন্দর অ্যান্টিক গাড়ি, তাই না?’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন-‘বাদল ভাই, আপনি কাঁদছেন কেন?’
আমার ঠোঁট কাঁপছে। কোনোরকমে উচ্চারিত হলো একটি শব্দ- ‘বড়মামা…। ‘
#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category