• বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ অপরাহ্ন
Headline

হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা রেখে বিলুপ্ত হচ্ছে বিআরটি

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানীর গণপরিবহনে আধুনিক ও যুগান্তকারী রূপান্তরের স্বপ্ন দেখিয়ে এক দশক পেরিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত এক করুণ ও নজিরবিহীন অপচয়ের সাক্ষী হলো গোটা দেশ। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের লাখ লাখ মানুষকে ধুলাবালি, চরম যানজট আর সীমাহীন দুর্ভোগে নিমজ্জিত রেখে নির্মিত দেশের প্রথম বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পটি এখন ভেঙে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের দায় কাঁধে চেপে বসলেও এই রুটে কোনো দিন একটি বিশেষায়িত বাসও নামানো সম্ভব হয়নি। যানজটমুক্ত দ্রুতগামী যাতায়াতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গড়ে তোলা বিশেষায়িত লেন, আধুনিক স্টেশন ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো ভেঙে এখন সড়কটিকে সাধারণ ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে একটি আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থার অপমৃত্যু যেমন ঘটল, তেমনি জনগণের রক্তপানি করা করের টাকার এমন নির্মম অপচয় দেশের বড় অবকাঠামোগত পরিকল্পনার চরম অদূরদর্শিতা ও ব্যর্থতাকেই জাতির সামনে নগ্নভাবে উন্মোচিত করল।

গত রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নীতিনির্ধারণী বৈঠকে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে সোমবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে চিঠি দিয়ে এই নির্দেশনার আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্দেশনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত করিডোরের বিশেষায়িত প্ল্যাটফর্ম, লেন বিভাজক ও স্টেশনের যাবতীয় অবকাঠামো পর্যায়ক্রমে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এসব কাঠামো অপসারণের পর মূল সড়কটিকে উভয় পাশে তিন লেন করে মোট ছয় লেনের একটি সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে উন্মুক্ত করা হবে। তবে প্রকল্পে নির্মিত দুটি ওভারপাস ভেঙে না ফেলে সেগুলোর বর্তমান দুই লেনের ধারণক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করে চার লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বিআরটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি’ চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হচ্ছে। এর যাবতীয় দায়দায়িত্ব ও তদারকি এখন সোপর্দ করা হচ্ছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ওপর। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দেনদরবার ও আইনি বোঝাপড়া চুকিয়ে দ্রুততম সময়ে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কোনো রকম কালক্ষেপণ না করার কড়া বার্তা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী পনেরো দিনের মধ্যেই প্রকল্প এলাকার অবকাঠামো ভাঙা ও রূপান্তরের প্রাথমিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এরপর পুরো কাজ চূড়ান্তভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের তিন তারিখের মধ্যে নিয়মিত তদারকি প্রতিবেদন সরকারের শীর্ষ মহলে পাঠাতে হবে। তবে সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা বিআইপি সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে এক চরম ‘কালো দিন’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নেওয়া বিপুল ঋণের বোঝা এখন দেশের সাধারণ নাগরিক ও জাতীয় বাজেটকে আগামী দুই দশক ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। অথচ এর বিনিময়ে নাগরিকরা আধুনিক গণপরিবহনের কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হলো। বরং অপরিকল্পিতভাবে এক অবকাঠামো ভেঙে আবার নতুন করে সড়ক পুনর্নির্মাণের এক আত্মঘাতী অধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড় করানো হলো জনগণকে।

ফিরে তাকালে দেখা যায়, ২০১২ সালে যখন বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় বিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাস করিডোরের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল, তখন এটিকে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার এক বৈপ্লবিক মোড় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এই পথ দিয়ে গাজীপুর থেকে মাত্র কয়েক মিনিটে মানুষ যানজটমুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে রাজধানীতে যাতায়াত করতে পারবেন। কিন্তু দীর্ঘ বারো বছর নির্ধারিত মেয়াদ এবং পরবর্তীতে দফায় দফায় সময় বাড়িয়েও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল চার হাজার দুইশত আটষট্টি কোটি বত্রিশ লাখ টাকা, যার মধ্যে ইতিমধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি সরকারি ও বিদেশি ঋণ গলে গেছে। নির্মাণকাজ পরিচালনাকারী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে ভৌত অবকাঠামো প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ শেষ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও সরকারি নথিতে সার্বিক অগ্রগতি আটকে ছিল মাত্র পৌনে আটাত্তর শতাংশে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আধুনিক বাস চালানো, দীর্ঘ চৌদ্দ বছরে সেই প্রকল্পের জন্য একটিমাত্র বাসও ক্রয় করতে পারেনি সরকার।

বিআরটি ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো বিশেষভাবে নির্মিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস। অথচ পুরো এক যুগেও নীতি নির্ধারকেরা ঠিক করতে পারেননি তারা কেমন বাস নামাবেন। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বা এসক্যাপের পক্ষ থেকে আঠারো মিটার দীর্ঘ স্বয়ংক্রিয় দরজাবিশিষ্ট আর্টিকুলেটেড বাস নামানোর সুপারিশ করা হলেও তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাতিল হয়ে যায়। এরপর পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস কেনার কথা বলে দরপত্র ডাকা হলেও রহস্যজনক কারণে তা প্রত্যাহার করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে এসে একশত সাঁইত্রিশটি ডিজেলচালিত এসি বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেই উদ্যোগেও কোনো আলোর মুখ দেখা যায়নি। এমনকি বাস ক্রয়ের জন্য ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি থেকে বরাদ্দকৃত বাষট্টি মিলিয়ন ইউরোর বৈদেশিক ঋণ কোনো কাজেই লাগানো যায়নি। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় বাস না চললেও জাতীয় বাজেট থেকে নিয়মিত চড়া সুদে কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে।

মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিআরটি অবকাঠামো এখন পরিণত হয়েছে এক ভুতুড়ে ও জরাজীর্ণ ভগ্নাবশেষে। পুরো করিডোরে নির্মিত পনেরোটি স্টেশনের একটিও কোনো দিন যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণঅভ্যুত্থানের পর স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে উত্তরার স্টেশনে বসানো অত্যাধুনিক চলন্ত সিঁড়ি বা এসকেলেটর বছরের পর বছর পলিথিন মোড়ানো অবস্থায় অচল হয়ে পড়ে থেকে রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। মূল্যবান লিফট, বৈদ্যুতিক কেবল ও ধাতব যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধুলাবালি আর মরিচায় ধসে পড়ছে। বর্তমানে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই বিশেষায়িত লেনে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাধারণ যানবাহন ও লেগুনা চলাচল করছে, যা আধুনিক বিআরটির ধারণার সঙ্গেই পুরোপুরি অসঙ্গতিপূর্ণ।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটময় মুহূর্তে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের সামনে চারটি পথ খোলা ছিল। প্রথমত, বাকি কাজ শেষ করে অবিলম্বে বাস নামানো। দ্বিতীয়ত, বিআরটি করিডোর ও সাধারণ লেন উভয়েই চলতে পারে এমন সমন্বিত ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা। তৃতীয়ত, পুরো করিডোরকে একটি পূর্ণাঙ্গ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করা। আর চতুর্থটি ছিল সব অবকাঠামো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়ে সাধারণ মহাসড়ক বানিয়ে দেওয়া। সরকার এর মধ্যে সবচেয়ে অদূরদর্শী ও চরম ধ্বংসাত্মক চতুর্থ বিকল্পটিকেই বেছে নিয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ বাড়াবে এবং গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বদলে কতিপয় নির্মাণ ঠিকাদার ও প্রভাবশালী পরিবহন লবির স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেবে। এর ফলে রাজধানী ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা এবং গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যানের মূল দর্শন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

নাগরিক সমাজ ও পরিবহন বিশ্লেষকরা এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, চৌদ্দ বছর ধরে যে সাধারণ মানুষ সড়কের বিষাক্ত ধুলা গিলে জীবন পার করলেন, তাদের সঙ্গে এটি চরম প্রতারণা। মন্ত্রিসভার মতো সর্বোচ্চ ফোরামে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বিষয়টি চেপে রাখা বড় ধরনের অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীনতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষজ্ঞ মহলের জোর দাবি, বিআরটি পুরোপুরি বাতিলের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো গুঁড়িয়ে ফেলার আগে এমআরটি ও বিআরটি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষায়িত বাস নামানোর বিকল্পগুলো আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যথায় ঋণের বোঝা ও জনগণের চরম ক্ষোভের দায় কোনো দিন এড়াতে পারবে না দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category