মিয়ানমারে চলমান জাতিগত নিধন ও সংঘাতের মুখে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবিক সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা জোরদার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য মোট ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে দেশটি। আন্তর্জাতিক বার্তা ও জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের (ওসিএইচএ) উদ্ভাবিত নতুন আর্থিক অর্থায়ন কাঠামোর আওতায় এই বিশালাকার তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে বিভিন্ন মানবিক তহবিলে যখন টানাটানি চলছে, তখন ওয়াশিংটনের এই বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক অনুদান কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মানবিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘ এবং এর আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলোর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের দৈনন্দিন মৌলিক চাহিদা মেটাতে সব মিলিয়ে প্রায় ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের এক বৈশ্বিক মানবিক আর্থিক আবেদন উপস্থাপন করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে গত বছরের মূল অর্থ চাহিদার তুলনায় চলতি বছরের মানবিক বাজেট প্রায় ২৬ শতাংশ কমিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে। সম্পদের সীমিত বরাদ্দের কারণে এবারের আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনায় ঢালাও উন্নয়ন কাজের বদলে মূলত জীবন রক্ষাকারী জরুরি খাদ্য, সুপেয় পানি, চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষামূলক কার্যক্রমগুলোকে শীর্ষ অগ্রাধিকারের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের সমন্বিত মানবিক সহায়তা রূপরেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক খাতগুলোতে অর্থ বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট বিভাজন করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্যই দরকার ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। বাসস্থান বা জরুরি আশ্রয় পুনর্নির্মাণে ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার, সুপেয় পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬ কোটি ১২ লাখ ডলার, শরণার্থী শিশুদের পড়াশোনার জন্য ৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা খাতের পেছনে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ডলার অর্থ বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবির, নোয়াখালীর ভাসানচর এবং আশপাশের স্বাগতিক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে জরুরি জীবন রক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের ওসিএইচএ-এর আনুষ্ঠানিক বার্ষিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা থেকে শুরু করে বিগত ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্ব সম্প্রদায় এই বিশাল মানবিক কার্যক্রমে মোট প্রায় ৫৪২ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে প্রদান করেছে। বিগত আট বছরের এই বৈশ্বিক অর্থ সহায়তায় একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় ও উদার দাতা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া এই সুদীর্ঘ মানবিক সংকটে শুরু থেকেই অব্যাহত আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু বন্ধুভাবাপন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্র।
তবে সংকটের পরিধি কমার বদলে দিন দিন আরও জটিল রূপ ধারণ করছে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত, গৃহযুদ্ধ এবং জান্তা সরকারের নিপীড়ন জোরদার হওয়ার কারণে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে প্রাণ বাঁচিয়েছে। নতুন এই দলটিকে অন্তর্ভুক্ত করার পর বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে মোট আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখে। একদিকে নতুন বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন এবং অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে ক্রমান্বয়ে মানবিক সহায়তার তহবিল সংকুচিত হয়ে আসায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে দৈনন্দিন খাদ্য বিতরণ, রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য চরম চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী ও টেকসই সুরাহার জন্য শুরু থেকেই মিয়ানমারে তাদের মাতৃভূমিতে নিরাপদ, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ। তবে অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের অনুকূল ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই বিশাল আশ্রিত জনগোষ্ঠী এবং তাদের উদারভাবে ঠাঁই দেওয়া স্থানীয় অধিবাসীদের মানবিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিরবচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।