যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত তথাকথিত নৌ-অবরোধ মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। সংস্থাটির মতে, এই নৌ-অবরোধ মূলত চীন, রাশিয়া ও ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ ছিল, যা এখন সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই তথ্য প্রকাশ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে আইআরজিসির এই দাবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থা দাবি করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বমঞ্চে তাদের ‘গ্লোবাল এনার্জি ব্যবস্থাপনা’ (Global Energy Management) কৌশল থেকে সরে এসে নতুন করে ‘বাধা সৃষ্টি’র (Disruption) কৌশল গ্রহণ করেছিল। এই নৌ-অবরোধ সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ।
সংস্থাটির দাবি, মাত্র ২০ দিন পার হতেই হোয়াইট হাউজ অনুধাবন করতে পেরেছে যে তাদের এই কৌশল কাজে আসেনি। বরং এই অবরোধের ফলে তেহরান এখন বিশ্বমঞ্চে ‘অস্থিতিশীলতাবিরোধী জোটের’ (Anti-Disruption Coalition) প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই নৌ-অবরোধ ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সূচনা হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিনা উসকানিতে ইরানের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলায় ইসলামী বিপ্লবের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়।
একই দিন ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে মার্কিন টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৬৮ জন নিরপরাধ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, যা পুরো ইরানকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
শীর্ষ নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যার কড়া জবাব দিতে ইরান টানা ৪০ দিনে ১০০ দফা পাল্টা হামলা চালায়। এই ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের এই ধারাবাহিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সংঘাত যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন গত ৭ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের একটি পারস্পরিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। এরপর প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দলের মধ্যে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
টানা এই সংঘাতে ইরানে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৩৭৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৮৭৫ জন এবং নারী ৪৯৬ জন।
যুদ্ধকালীন সময়ে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়েও বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। জরুরি চিকিৎসা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় অন্তত ১১৮ জন চিকিৎসাকর্মী আহত হয়েছেন এবং ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আইআরজিসির এই বিবৃতি এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি বর্তমানে উভয় পক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ ও কূটনৈতিক লড়াইও চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।