“মাদক গডফাদাররা আমার সন্তানতুল্য ছাত্রদের জীবন বিষিয়ে দিচ্ছে। পড়ালেখা ছেড়ে তারা অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। বেশ কয়েকবার ওদের ফেরানোর চেষ্টা করায় কাউসার নামের এক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আমাকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।” ঢাকার মিরপুর-পল্লবী এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক প্রবীণ শিক্ষক অত্যন্ত ক্ষোভ ও আতঙ্ক নিয়ে এভাবেই রাজধানীর মাদক পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু পল্লবী এলাকাতেই বর্তমানে অন্তত ২০টি সক্রিয় মাদক স্পট রয়েছে, যেখানে গডফাদারের অধীনে ১৬-১৭ জন মাঠ নিয়ন্ত্রক এবং অসংখ্য খুচরা বিক্রেতা দিনরাত মাদকের পসরা সাজিয়ে বসেছে। এমনকি বহুতল ভবনের নিরাপত্তা কর্মীদেরও তারা এই মরণনেশার বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে, যার প্রধান শিকার হচ্ছে স্কুল-কলেজের উদীয়মান তরুণ শিক্ষার্থীরা।
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো ঢাকা মহানগরী জুড়ে সব ধরনের মাদক সাম্রাজ্যের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে ২৩১ জন চিহ্নিত গডফাদার। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আটটি ক্রাইম জোনের অধীনে থাকা প্রতিটি থানা এলাকায় গড়ে ১০ থেকে ১২টি করে কয়েক শ প্রকাশ্য ও গোপন মাদক স্পট ছড়িয়ে রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এসব গডফাদারের হয়ে কাজ করছে সহস্রাধিক খুচরা কারবারি। যদিও ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে মাদক নিয়ন্ত্রণে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতির কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, তবুও মাঠ পর্যায়ের থানা পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা ও গাফিলতিতে শীর্ষ কর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাজধানীতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে বড় আইন-শৃঙ্খলাগত চ্যালেঞ্জ, কারণ রাজধানীর প্রায় ৬০ শতাংশ অপরাধের মূল উৎসই হলো এই মাদক।
গত ১ মে থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া বিশেষ যৌথ অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ পাঁচ হাজারের বেশি কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মাদকের তালিকায় রয়েছে ৫২ লাখের বেশি ইয়াবা, ৫ হাজার ৬৮৯ গ্রামের বেশি হেরোইন, ২ হাজার বোতলের বেশি ফেনসিডিল এবং প্রায় ৭ হাজার ৭২৫ কেজি গাঁজা। তবে প্রতিদিন শত শত সন্দেহভাজনকে আটক করা হলেও মূল হোতারা সবসময়ই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদিকে, এলিট ফোর্স র্যাবের তৈরি তালিকায় দেশজুড়ে তিন হাজারের বেশি মাদক কারবারিকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ও এর আশেপাশের র্যাব-২, র্যাব-৪, র্যাব-১, র্যাব-৩ এবং র্যাব-১০ এর এলাকাগুলোতেই এক হাজারের বেশি পেশাদার মাদক অপরাধী সক্রিয় রয়েছে, যাদের তালিকা ধরে বর্তমানে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
বিশেষ এই শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেও রাজধানীর কিছু কিছু এলাকায় সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হতে দেখা গেছে, যার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যৌথ বাহিনী এই ক্যাম্পে দফায় দফায় সাঁড়াশি অভিযান চালালেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার বদলে উল্টো মাদক কারবার আরও চাঙ্গা হয়েছে। ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকারী তালিকাভুক্ত গডফাদারদের আতঙ্কে সাধারণ বাসিন্দারা তটস্থ। মনু ওরফে গালকাটা মনু, ইমতিয়াজ, শাহ আলম, বিল্লু, সালাম, নেটা সেলিম ও লালনের মতো দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা ৪০-৫০ জন সশস্ত্র সহযোগী নিয়ে পুরো ক্যাম্পের খুচরা নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দীন জানান, পুলিশ প্রতিনিয়ত সেখানে অভিযান চালাচ্ছে এবং অনেক শীর্ষ অপরাধীকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ৩৬টি মাদক মামলার আসামি ‘বুনিয়া সোহেল’ সহ অনেক গডফাদার যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধ চক্র সচল করছে।
বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ সমন্বয়ে দেশব্যাপী মাদক কারবারিদের একটি বিশদ তালিকা হালনাগাদ করার কাজ চলছে। এই তালিকায় পুলিশের দেওয়া ১৯ হাজার ৪৫ জন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩ হাজার ৯৬৪ জন এবং একটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় প্রায় ২১ হাজার মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। শুধু ঢাকা নয়; টেকনাফ, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও রাজশাহীর মতো সীমান্ত ও ট্রানজিট জেলাগুলোতেও স্থানীয় গডফাদাররা পুরো সিন্ডিকেট ধরে রাখছে।
মাদকের এই নজিরবিহীন সামাজিক মরণনেশা প্রতিরোধে গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় এক জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে কেবল ভয়ভীতি বা আইনি নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, এর জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিজ্ঞানভিত্তিক, আধুনিক ও সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তিনি সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এক হয়ে মাদকের বিরুদ্ধে একটি কঠোর সামাজিক প্রতিরোধ বা গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ