বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা যেমন অনেক, তেমনি শঙ্কার জায়গাও কম নয়। ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাইবেরিয়া থেকে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি দেশে এসে পৌঁছেছে। এই জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে প্রকল্পটি মূলত নির্মাণকাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও কমিশনিংয়ের এক নতুন অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। তবে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই মেগা কেন্দ্র থেকে কবে নাগাদ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। ইউরেনিয়াম আসা মানেই যে আগামীকাল থেকে জাদুকরিভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। প্রথম ইউনিটকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ও নিরাপদে ক্রিটিক্যালিটি বা পারমাণবিক বিক্রিয়ার পর্যায়ে নেয়া, এরপর জাতীয় গ্রিডের সাথে সিনক্রোনাইজ বা যুক্ত করা এবং সবশেষে ধাপে ধাপে পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় পৌঁছানোর জন্য আরো বেশ কিছু জটিল কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ধাপ অতিক্রম করতে হবে। সরকারি সর্বশেষ তথ্যমতে, প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কাজের প্রায় ৯৮ শতাংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রাথমিক কমিশনিংয়ের একটি বড় অংশের পাশাপাশি জ্বালানি-সংক্রান্ত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ধাপও সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এর ফলে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি অনেকটাই এগিয়ে গেছে বলে ধরা যায়।
তবে এই বিশাল অর্জনের পাশাপাশি প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্পে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এরপর গত প্রায় দেড় বছরে মোট খরচের কোনো সুনির্দিষ্ট বা হালনাগাদ হিসাব রাখা হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও ঠিক কবে নাগাদ দেশের মানুষ রূপপুর থেকে বাণিজ্যিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবে, তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। শুরুতে এই প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। কিন্তু নানা জটিলতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সেই মেয়াদ বাড়িয়ে এখন ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। সময় বাড়ার সাথে সাথে প্রকল্পের অনুমোদিত মোট ব্যয়ও লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ, খরচ বেড়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, রাশিয়ার সাথে চুক্তিকৃত ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের মূল খরচ একই আছে, মূলত ডলারের বিপরীতে টাকার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়নের কারণেই দেশীয় মুদ্রায় এই ব্যয়ের অঙ্ক এতটা বেড়ে গেছে।
সময় এবং ব্যয় বৃদ্ধির এই নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের এই কঠিন সময়ে রূপপুর প্রকল্পের এমন বিলম্বের অর্থনৈতিক মাশুল অত্যন্ত চড়া। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করতে না পারায় একদিকে যেমন দেশ কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বিশাল অঙ্কের বিদেশী ঋণের সুদ ও প্রকল্প পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই বিলম্বকে এখন আর কেবল একটি সাধারণ নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম শেষ পর্যন্ত কত হবে, তা নিয়েও রয়েছে ব্যাপক ধোঁয়াশা ও বিতর্ক। উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয় এখন প্রাক্কলিত হিসাবের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু সরাসরি উৎপাদন খরচ হিসাব করলে এর পূর্ণাঙ্গ চিত্র কখনো পাওয়া যাবে না। ২০২৬ সালের একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পিউর-রিভিউড গবেষণায় দেখা গেছে, মূলধন, বিদেশী অর্থায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ, পারমাণবিক জ্বালানি ক্রয়, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মেয়াদ শেষে ডিকমিশনিং বা কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ করার খরচসহ পুরো জীবনচক্রের ব্যয় বা লাইফসাইকেল কস্ট হিসাব করলে বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে যায়। ওই গবেষণায় গড় লেভেলাইজড কস্ট অব ইলেকট্রিসিটি বা এলসিওই ধরা হয়েছে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টায় ৮৪ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ১০ পয়সা) অনুযায়ী হিসাব করলে প্রতি ইউনিট বা কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম পড়ে প্রায় ১০ টাকা ৩৪ পয়সা। আর যদি ব্রেক-ইভেন বা লাভ-ক্ষতির সমতার কথা চিন্তা করা হয়, তবে তা দাঁড়ায় ৯৭ ডলার বা ১১ টাকা ৯৪ পয়সায়। অথচ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রাথমিকভাবে প্রতি ইউনিটের দাম প্রক্ষেপণ করেছিল মাত্র ৬ টাকা ৭২ পয়সা। রাশিয়ার ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণ এবং তার পুঞ্জীভূত সুদ এই খরচের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সরাসরি উৎপাদন ব্যয় ৪ টাকা ৩১ পয়সা বলা হলেও, বাস্তবসম্মত খরচভিত্তিক বাল্ক ট্যারিফ প্রতি ইউনিটে ১০ থেকে ১২ টাকার পরিসরে হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, যদিও এটি সরকারের চূড়ান্ত ট্যারিফ নয়।
কারিগরি দিক থেকে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি বেশ সতর্কতার সাথে সাজানো হয়েছে। একবারে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেয়া হবে না। সরকারি স্টিয়ারিং কমিটির রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে প্রাথমিক গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন শুরু করা হবে। এরপর অত্যন্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রায় চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ধীরে ধীরে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হবে। কমিশনিং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে পার হওয়ার পরই কেবল ইউনিটটিকে জাতীয় গ্রিডের সাথে সম্পূর্ণ স্থিতিশীলভাবে যুক্ত করা হবে। ইতোমধ্যে প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটের লাইনের কাজ ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিয়্যাক্টর, টারবাইন, প্রোটেকশন সিস্টেম এবং গ্রিডের সমন্বিত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই ক্ষমতা এভাবে ধাপে ধাপে বাড়াতে হয়। প্রথম ইউনিটের কমিশনিং প্রক্রিয়াকে প্রাক-কমিশনিং, উষ্ণ কমিশনিং, ক্রিটিক্যালিটি ও নিম্নক্ষমতা পরীক্ষা এবং গ্রিড সিনক্রোনাইজেশন- এই চারটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে, যার মধ্যে বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের কাজ চলমান রয়েছে।
দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও প্রথমটির তুলনায় খুব একটা পিছিয়ে নেই। এই ইউনিটের পূর্ত বা সিভিল কাজের অগ্রগতি ৯১ শতাংশ এবং যন্ত্রপাতি ইনস্টলেশনের কাজ ৮২ শতাংশ শেষ হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর থেকেই দ্বিতীয় ইউনিটের প্রাক-কমিশনিং কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। রূপপুরের বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেয়ার জন্য ব্যাপক ট্রান্সমিশন অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে এবং জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের সাথে ইন্টিগ্রেশনের কাজ নিবিড়ভাবে চলছে। ফ্রিকোয়েন্সি কন্ট্রোল এবং ইমার্জেন্সি রেসপন্স সিস্টেমের মতো বিষয়গুলো এখানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তাছাড়া রূপপুরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কড়া নজরদারিতে রয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে আইএইএ প্রি-ওসার্ট মিশন, নভেম্বরে বায়েরা ও রুশ নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শন এবং আইপিপিএএস মিশন, ২০২৬ সালের নভেম্বরে ইপিআরইভি মিশন এবং ডিসেম্বরে আইএনআইআর ফেস-৩ মিশনের সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে।
একটি পারমাণবিক কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের কোনো বিকল্প নেই। রূপপুর প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত ২ হাজার ৯০০ পদের বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৯২৮ জন কর্মরত আছেন এবং ১ হাজার ২৯০ জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী প্রস্তুত রয়েছেন। প্রকল্প নির্মাণের তুঙ্গস্পর্শী সময়ে কর্মীর সংখ্যা ২৪ হাজারে পৌঁছালেও বর্তমানে তা ১২ হাজারে নেমে এসেছে। কেন্দ্রটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য রাশিয়ার সাথে পরিচলন সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের তিনটি আলাদা সার্ভিস চুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। রাশিয়ার প্রদানকৃত ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে। ৩৮টি অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে এই ঋণ শোধ করতে হবে, যার ফলে প্রতি বছর শুধু আসল বাবদই প্রায় ৫৯৯ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখা এবং ঋণের কিস্তিসহ প্রকৃত ট্যারিফের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার মতো তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। জ্বালানি লোড হওয়া একটি বড় মাইলফলক হলেও কেন্দ্রটি সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করলেই কেবল রূপপুরের প্রকৃত সাফল্য দৃশ্যমান হবে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত