• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৪ অপরাহ্ন
Headline
নিষিদ্ধ দলের ঝটিকা মিছিলে কঠোর অবস্থানে সরকার: রাজনৈতিক গুঞ্জনে উত্তাল ডিসেম্বর ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন: ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ও ২৫ কিমি গতিসীমা নির্ধারণ শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা: জাপানের সব শর্ত মেনে নিল বাংলাদেশ ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর: ভারত থেকে আমদানিকৃত চালে ক্যানসারের উপাদান ব্যাংক খাতে আস্থার নতুন মাপকাঠি: ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে আট বেসরকারি ব্যাংক বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৬ ভারতে মুসলিম-দলিতদের প্রতিনিয়ত নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে: নেহা গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বিহারের নতুন দাবি ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে ট্রানজিট বন্ধের হুঁশিয়ারি নাহিদ ইসলামের ফলাফল সন্তোষজনক নয় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার নির্দেশ

৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর: ভারত থেকে আমদানিকৃত চালে ক্যানসারের উপাদান

Reporter Name / ৪ Time View
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

ভারত থেকে আমদানিকৃত সরকারি চালের চালানে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান ‘আফলাটক্সিন’-এর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামগুলোতে সংরক্ষিত ওই চালের নমুনায় এই ক্ষতিকর উপাদান পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে খাদ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে ওই চালানের প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ কার্যক্রম স্থগিত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনালের সরবরাহ করা এই চাল নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৭ আগস্ট, যখন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি-এর তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল চট্টগ্রামের হালিশহর এবং দেওয়ানহাট সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো বা সিএসডির চালের স্তূপ থেকে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে। পরবর্তীতে গবেষণাগারে সেই নমুনা পরীক্ষা করা হলে হালিশহর এবং ঢাকার সরকারি গুদামে রাখা চালের মধ্যে বিষাক্ত আফলাটক্সিন উপাদানের উপস্থিতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পরই খাদ্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট গুদামগুলোতে চাল বিতরণ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে খাদ্য কর্মকর্তারা চালের লটটি দুবার পরীক্ষা করেছেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চাল বিতরণ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বলেছেন।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার মূল্যে মোট ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তির অংশ হিসেবে এই চালানটি দেশে আনা হয়েছিল। আমদানিকৃত এই চালের প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন ওজনের চূড়ান্ত চালানটি বহনকারী জাহাজ ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। পরদিন খাদ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জাহাজ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছিল। প্রাথমিক পরীক্ষার রিপোর্টে চাল খাওয়ার উপযোগী বলে ঘোষণা করা দেওয়ায় ২৪ ও ২৫ জুলাই চালগুলো চট্টগ্রাম, ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন সরকারি গুদামে খালাস করে পাঠানো হয়।

তবে গুদামে পৌঁছানোর পর স্থানীয় খাদ্য কর্মকর্তারা চালের মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং কিছু চাল অত্যন্ত নিম্নমানের ও খাওয়ার অনুপযোগী বলে অভিযোগ তোলেন। সেই সময় বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন নিম্নমানের চাল জাহাজে করে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গুদামে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হওয়ায় খাদ্য অধিদপ্তর অধিকতর ও বিস্তারিত পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক সংগ্রহ মনিরুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে প্রাথমিক তদন্তে চালে ক্ষতিকর আফলাটক্সিন পাওয়ায় ভারত থেকে আমদানি করা ওই ১৩৫ টন চাল কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না বলে তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। জনস্বার্থ রক্ষার্থেই সরকার এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এদিকে চালে ক্যানসারের উপাদান পাওয়ার এই গুরুতর অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে মূল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক ইমেইল বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশের খাদ্য কর্মকর্তা এবং তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের যৌথ উপস্থিতিতে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি নামী পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তা সমস্ত চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করেছিল। ব্রির সিলগালা করা যৌথ নমুনায় কোনো ধরনের আফলাটক্সিন পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে সরবরাহকারী। এছাড়া বিতরণ কার্যক্রম হঠাৎ স্থগিত করার আগে তাদের কাছে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা অসন্তোষের কথা জানানো হয়নি বলে তারা দাবি করে।

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের শিপিং এজেন্ট সেভেন সিজ শিপিং লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করা এই প্রতিষ্ঠানের সম্মান ক্ষুণ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা যদি বারবার ঘটতে থাকে, তবে ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক মানের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আর বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাবে না, যা প্রকারান্তরে দেশকে এক মারাত্মক খাদ্য সংকটের মুখে ফেলে দিতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কাজী শিরীন আক্তার জাহান এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে দীর্ঘ সময় ধরে বদ্ধ বা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে সংরক্ষিত চালে প্রাকৃতিকভাবেই আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে নমুনায় যে পরিমাণ উপাদান শনাক্ত হয়েছে, তা অনেক সময় সহনীয় মন্ত্রার মধ্যেও থাকতে পারে। তবে তিনি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে এই সহনীয় মাত্রা কোনোভাবে অতিক্রম করলে আফলাটক্সিন মানবদেহের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা তৈরি করতে পারে।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট গুদাম ও দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্তকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে অধিকতর ও নিখুঁত পরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই ৯ হাজার ৫০০ টন চালের কোনো অংশই বিতরণ করা হবে না। প্রাথমিক নমুনাগুলো পুরো চালানের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছিল কিনা তা নিয়ে খাদ্য বিভাগের ভেতরেও কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে। চালে থাকা বিষাক্ত উপাদানের সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব কতটুকু, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও ল্যাব পরীক্ষার প্রক্রিয়া আরও অনেক বেশি কঠোর এবং স্বচ্ছ হওয়া উচিত। বন্দর বা গুদামে পৌঁছানোর পর চালের গুণগত মান যাচাইয়ে যদি এ ধরনের বড় ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

জনসাধারণের মৌলিক খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করে আমদানিকৃত চালের প্রতিটি চালানের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ ল্যাব টেস্ট নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ক্যানসারের উপাদানযুক্ত চাল যদি শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যতালিকায় চলে যেত, তবে তা এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত।

বর্তমানে স্থগিত থাকা ৯ হাজার ৫০০ টন চালের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং অধিকতর পরীক্ষায় যদি ক্ষতিকর উপাদানের চূড়ান্ত সত্যতা মেলে, তবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনি বা আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেদিকে এখন সবার নজর রয়েছে।

খাদ্য বিভাগের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান নির্ভর করছে। সরকারের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category