রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংঘাত ও পটপরিবর্তনের পর একটি বিভক্ত সমাজকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে জাতীয় পুনর্মিলন বা ‘রিকনসিলিয়েশন’ একটি কার্যকর রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে| তবে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পটভূমিতে এই ধারণার বাস্তবায়ন কতটা যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক গভীর মতভেদ ও টানাপোড়েন শুরু হয়েছে| বিশেষ করে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পর ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংঘটিত অপরাধের দায় অস্বীকার করা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে অনবরত হুমকি-ধমকি দেওয়ার সংস্কৃতি পুনর্মিলনের পথকে পুরোপুরি রুদ্ধ করে রেখেছে| এই বাস্তবতায় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি এক বহুমুখী প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে| অপরাধের দায় ও ভুল স্বীকার করে জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, গণহত্যার বিচার এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কি পুনর্মিলনের ক্ষেত্র তৈরি হবে, নাকি এর আগেই কোনো বৃহত্তর রাজনৈতিক আপস বা বোঝাপড়া জরুরি—এই দ্বন্দ্বই এখন প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে| বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, সমাজকে সংঘাতমুক্ত রাখতে পুনর্মিলনের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো ইতিবাচক অনুকূল পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি| কারণ, যাদের আত্মোপলব্ধি ও অনুশোচনা প্রকাশ করার কথা ছিল, তারা উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিশোধের আস্ফালন দেখিয়ে যাচ্ছেন|
এ বিষয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ডক্টর আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির সঙ্গে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর রাজনৈতিক সমঝোতা কোনো স্বাভাবিক পথ হতে পারে না| তবে কোনো দল যদি তাদের অতীত শাসনকালের নজিরবিহীন দুঃশাসন ও রক্তপাতের জন্য জাতির কাছে অকপটে ভুল স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায়, তবে যারা মানবতাবিরোধী বা গুরুতর অপরাধে সরাসরি অংশ নেয়নি, তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিষয়টি সমাজ বিবেচনা করতে পারে| কিন্তু দীর্ঘদিনের ঔদ্ধত্যের কারণে সেই দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়ার কোনো বাস্তব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না| অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের সম্পাদক ডক্টর বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টিকে জাতীয় টিকে থাকার বৃহত্তর প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন| তাঁর মতে, একটি জাতি যখন চিরস্থায়ী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকে এবং একে অপরকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার সর্বনাশা খেলায় মেতে ওঠে, তখন সেই জাতি কখনোই একটি কার্যকর ও টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারে না| একটি আধুনিক শাসনযোগ্য দেশ গড়তে হলে পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই| তবে এর ভিত্তি হতে হবে খোলামন, অতীত ভুলের নির্মোহ অনুধাবন এবং ভবিষ্যতে এমন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় অঙ্গীকার| যারা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সীমাহীন লুণ্ঠন ও নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের মধ্যে যদি নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের উপলব্ধি না জাগে, তবে একতরফা সমঝোতা কখনই স্থায়ী রূপ পেতে পারে না|
অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধির স্বার্থে প্রতিশোধের চিরচেনা অন্ধকূপ থেকে বেরিয়ে আসাকে অপরিহার্য বলে অভিহিত করেছেন বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ| তিনি এই কঠিন প্রক্রিয়াটিকে জটিল অস্ত্রোপচারের সঙ্গে তুলনা করে উল্লেখ করেন যে, বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও জাতির দীর্ঘমেয়াদি আরোগ্যের স্বার্থে এটি গ্রহণ করা প্রয়োজন| এক দল ক্ষমতায় এসে লুটপাট করবে এবং পরবর্তীতে অন্য দল এসে আগের দলকে বিতাড়িত করবে—এমন অন্তহীন অস্থিতিশীলতার চক্রে বন্দি থাকলে বিশ কোটি মানুষের এই দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়| আওয়ামী লীগ ক্ষমা না চেয়ে রাজনৈতিক ভুল করছে ঠিকই, তবে বিজয়ী পক্ষ হিসেবে বর্তমান সরকারেরও একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়ার জাতীয় দায় রয়েছে| রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি কিংবা জাতীয় সংসদ একটি উন্মুক্ত পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার কাঠামো দাঁড় করাতে পারে, যা বৈশ্বিক অঙ্গনে এবং জনগণের কাছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে|
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠনে নানা মডেল অনুসরণ করেছে| সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ এই আলোচনাটি নতুন গতি পায়| সেখানে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট মত দেন যে, অপরাধীদের বিচার ও ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন ছাড়া সমাজে জোর করে পুনর্মিলন চাপিয়ে দেওয়া যায় না| জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বৈরশাসক ও সহিংসতাকারীদের আইনি দায়মুক্তি দিয়ে কোথাও স্থায়ী শান্তি আসেনি| বিশ্বজুড়ে যেসব পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে, তার মূল কারণ ছিল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা| সমকালীন ইতিহাসে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ একটি মাইলফলক হলেও তা কোনো নিছক সাধারণ ক্ষমা ছিল না| নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার বর্ণবাদী অপরাধের সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অপরাধীদের প্রকাশ্য দায় স্বীকারের পরই কেবল শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার সুযোগ দিয়েছিল| একইভাবে রুয়ান্ডার ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর আন্তর্জাতিক আদালতের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের ‘গাকাকা’ আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলন সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল| এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তির মুখোমুখি করেই ইউরোপে নতুন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল| সিয়েরা লিওন, কেনিয়া, পেরু কিংবা ফিলিপাইনসহ প্রায় চল্লিশটি দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, সত্য প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার ছাড়া কোনো পুনর্মিলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না|
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান সম্পর্কে সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডক্টর জাহেদ উর রহমান ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পতিত শক্তির ক্রমাগত হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগ বাড়িয়ে পুনর্মিলনের কথা বলা অবান্তর| পুনর্মিলন চাইতে হবে মূলত অপরাধী পক্ষকে এবং তার জন্য কিছু মৌলিক আইনি ও নৈতিক পূর্বশর্ত পূরণ করতে হবে| দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়| বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখায় একটি ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নীতিতেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’-এর কথা বলা হয়েছিল| তবে গণহত্যাকারী শীর্ষ নেতাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা এবং জুলাইয়ের হতাহতদের পরিবারের ক্ষোভের কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষেও কোনো ধরনের সমঝোতার পথে হাঁটা অসম্ভব হয়ে পড়েছে|
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা দেশে নির্বিচারে রক্তপাত ঘটিয়েছে এবং বিদেশে বসে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না| জনগণ বিচার ও অপরাধের দায় স্বীকার ছাড়া কোনো আপস মেনে নেবে না| জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও মনে করেন, অপরাধের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও অনুশোচনা ছাড়া এ নিয়ে কোনো আলোচনার জায়গাই থাকে না| জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বিষয়টির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক দিক তুলে ধরেছেন| তাঁর মতে, দল হিসেবে ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিচার হতে হবে, তবে তৃণমূলের যে বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল না, তারা যেন গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসতে পারে সেই পথটি খোলা রাখতে হবে| তবে এর প্রথম শর্ত হলো তাদের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষা ও গণরায়কে বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে|
অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে অন্ধ প্রতিশোধ নয়, বরং স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান আইনি প্রক্রিয়াই হতে হবে প্রথম পদক্ষেপ| কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ভেতরের একটি অংশ যদি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সত্যিকার অর্থেই জনগণের দরবারে ফিরে আসতে চায়, তবে তাদের স্বৈরতান্ত্রিক অহমিকা বিসর্জন দিয়ে কৃতকর্মের দায়ভার পুরোপুরি কাঁধে নিতে হবে| অন্যথায় রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো অলীক সমঝোতার চেষ্টা কেবল নতুন করে কর্তৃত্ববাদের বীজই রোপণ করবে এবং জাতীয় পুনর্মিলনের মহৎ ধারণাটিকে আরও একটি ঐতিহাসিক প্রহসনে রূপান্তর করবে|
তথ্যসূত্র: যুগান্তর