মানুষের জীবনের শেষ গন্তব্য হলো সাড়ে তিন হাত মাটি। সারা জীবনের দৌড়ঝাঁপ, হিসাব-নিকাশ আর অন্তহীন ক্লান্তির পর প্রতিটি মানুষ আশা করে চিরনিদ্রার এই স্থানটুকু অন্তত নিষ্কণ্টক হবে। গ্রামীণ জনপদে এখনো বাড়ির আঙিনায় বা পারিবারিক গোরস্তানে পরম মমতায় স্বজনদের সমাহিত করা হয়। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁর কালজয়ী কবিতায় ডালিম গাছের তলায় যে দাদির কবরের কথা বলেছিলেন, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট কবিতার পঙ্ক্তি নয়; এটি আবহমান বাংলার পারিবারিক শেকড়, স্মৃতি এবং প্রিয়জনকে হারানোর পর সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক শাশ্বত রূপক। কিন্তু ইট-পাথরের এই নিষ্ঠুর মেগাসিটি ঢাকায় সেই রূপক আজ এক চরম উপহাসে পরিণত হয়েছে। যে মাটির নিচে মানুষের জন্মদাত্রী মা, জন্মদাতা পিতা কিংবা প্রিয় সন্তান শুয়ে থাকে, সেই মাটি কেবল একখণ্ড সাধারণ জমি নয়, তা মানুষের আবেগ ও অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ প্রায় তিন কোটি মানুষের ভারে ন্যুব্জ এই ঢাকা শহরে আজ সেই স্মৃতিটুকু ধরে রাখার ন্যূনতম কোনো নিশ্চয়তা অবশিষ্ট নেই। জীবিত অবস্থায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে যে সংগ্রাম শুরু হয়, মৃত্যুর পর শেষ ঠিকানায় গিয়েও সেই সংগ্রামের কোনো সমাপ্তি ঘটে না।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা সহজেই অনুমেয়। এই বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে ঢাকা শহরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কবরস্থান রয়েছে মাত্র ১৩টি। বিশাল এই শহরের বুকে এই কবরস্থানগুলোর মোট জমির পরিমাণ মাত্র ২৫৩ একর। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে এই সামান্য জমিতে সর্বোচ্চ দুই লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৮ জন মানুষকে দাফন করার সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভাগে রয়েছে ১৯২ একর এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন জমির পরিমাণ মাত্র ৬১ একর। জনসংখ্যার গাণিতিক হিসাবের সঙ্গে দাফন সক্ষমতার এই বিস্তর ফারাকের কারণে রাজধানীর গোরস্তানগুলোতে এখন একটি সাধারণ কবরের সর্বোচ্চ আয়ু এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই বছরে। অর্থাৎ, আজ যাকে পরম মমতায় দাফন করা হলো, মাত্র চব্বিশ মাস পার হলেই জায়গার নিদারুণ অভাবে সেই একই কবরের মাটি খুঁড়ে অন্য কোনো অচেনা মরদেহের স্থান সংকুলান করা হবে। জসীমউদ্দীনের কবিতার মতো তিরিশ বছর পর চোখের জলে বুক ভাসিয়ে নাতিকে দাদির কবর চিনিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ এই শহরের বেশিরভাগ মানুষের ভাগ্যেই আর জুটছে না।
কবরের এই তীব্র সংকটের সুযোগ নিয়ে গোরস্তানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ও অপ্রতিরোধ্য চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক। স্বজনের কবরের চিহ্নটুকু অন্তত কিছুদিন টিকিয়ে রাখার করুণ বাসনায় সাধারণ মানুষকে প্রতি মাসে পকেট থেকে গুনতে হচ্ছে নগদ অর্থ। সিটি করপোরেশনের খাতায় একটি দাফনের জন্য নির্ধারিত ফি খুবই সামান্য হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের একটি মর্মান্তিক ঘটনা এই চাঁদাবাজির নগ্ন রূপটিকে সামনে নিয়ে আসে। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর তার শোকাহত পরিবার মরদেহ দাফনের জন্য নিয়ে যায় জুরাইন কবরস্থানে। খাতাকলমে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দাফন ফি তখন মাত্র এক হাজার টাকা। কিন্তু দাফনের কাজ শেষ করতে গিয়ে রফিকুলের পরিবারকে পদে পদে টাকা ছড়াতে হয়। তার এক স্বজনের দেওয়া তথ্যমতে, সরকারি ফি এক হাজার টাকা হলেও সেদিন পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তাদের কমপক্ষে দশ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছিল। কাঠের তৈরি সাধারণ একটি নামফলকের জন্য নেওয়া হয় ৩০০ টাকা। এরপর কবরটি একটু গুছিয়ে সাজানো এবং সাময়িকভাবে সংরক্ষণের কথা বলে এককালীন আরও এক হাজার টাকা আদায় করা হয়। এখানেই শেষ নয়, সদ্য স্বজন হারানো পরিবারটিকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, কবরটি অক্ষত রাখতে হলে প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হবে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই মাসিক চাঁদা দেওয়া নিয়ে এক ধরনের মানসিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীদের। শোকাহত পরিবারগুলোকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে হুমকি দেওয়া হয় যে, কোনো কারণে মাসিক টাকা দেওয়া বন্ধ হলে যেকোনো দিন কবরের মাটি সমান করে সেখানে নতুন মরদেহ দাফন করে দেওয়া হবে। স্বজন হারানোর তীব্র শোকের মধ্যেই তাই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায় এক নতুন দুশ্চিন্তা—কত দিন তারা প্রিয়জনের শেষ চিহ্নটুকু টিকিয়ে রাখতে পারবে? অনেকেই নিজেদের পেটের ক্ষুধা চেপে রেখে, ধারদেনা করে মাসে মাসে এই টাকা জুগিয়ে যান, শুধু এই আশায় যেন পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানরা তাদের হারানো প্রিয়জনের সান্নিধ্যে গিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারে বা দুহাত তুলে জিয়ারত করতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চাঁদাবাজির পেছনে রয়েছে একটি বিশাল সংঘবদ্ধ চক্র। সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন কবরস্থানগুলোতে দাফন ও পরিচর্যার জন্য নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং খাটোলি বা খাটিয়া বহনকারী থাকার কথা। প্রতি গোরস্তানে এমন কর্মীর সংখ্যা সাধারণত পনেরো থেকে বিশ জনের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রতিটি বড় কবরস্থানকে ঘিরে অন্তত একশো থেকে দেড়শো জনের একটি বিশাল ও অনানুষ্ঠানিক চক্র অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে সক্রিয় রয়েছে। সরকারিভাবে এদের কোনো বৈধ নিয়োগ নেই। নিজেদেরকে তারা গোরস্তানের ‘সহায়ক কর্মী’ হিসেবে পরিচয় দেয় এবং মরদেহ দাফন থেকে শুরু করে কবরের নিয়মিত পরিচর্যা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করে। বাঁশের বেড়া দিয়ে কবরের চারপাশ ঘেরার জন্য তারা দুই থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে। কবরের ওপর একটু সবুজ ঘাস লাগানো বা সাজানোর জন্য নেওয়া হয় এক হাজার টাকা। এরপর নিয়মিত পানি দেওয়া এবং দেখভালের চুক্তিতে মাসে মাসে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার যে অলিখিত ইজারা, তা মূলত এই চক্রটিই নিয়ন্ত্রণ করে। রায়েরবাজার কবরস্থানে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে কাজ করা এক কর্মীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি নির্দিষ্ট ভাগ সিটি করপোরেশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পকেটেও নিয়মিত চলে যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব জেনেও এই নৈরাজ্যের বিষয়ে একেবারে নিশ্চুপ থাকে।
সিটি করপোরেশনের সরকারি নীতিমালা এই বিষয়ে কী বলছে, তা পর্যালোচনা করলে বাস্তবতার সঙ্গে এর যোজন যোজন দূরত্ব চোখে পড়ে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ‘কবরস্থানসমূহের নীতিমালা-২০২২’ অনুযায়ী, সাধারণ এলাকার কবরগুলোতে বাঁশ, ইট, লোহা বা অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করে কোনো ধরনের স্থায়ী বা অস্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা বা বেড়া দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে দুই বছর পর্যন্ত জায়গাটি ব্যবহারের আইনি বিধান থাকলেও, বাস্তবে চাঁদাবাজ চক্রের কথামতো টাকা না দিলে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই কবরের চিহ্ন মুছে ফেলার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি পুরনো কবর খুঁড়ে কঙ্কাল ও হাড়গোড় চুরির মতো লোমহর্ষক অপরাধেরও একটি দীর্ঘস্থায়ী চক্র এখানে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে যে, কবরস্থানকেন্দ্রিক এই অসাধু চক্রের সরাসরি মদদ ও পাহারায় রাতের অন্ধকারে কঙ্কাল চুরির মতো জঘন্য অপরাধগুলো নির্বিঘ্নে সংঘটিত হয়ে থাকে।
যাদের মাসে মাসে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই তারা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি যাদের অগাধ অর্থ রয়েছে তাদের জন্যও কবর সংরক্ষণ পরিণত হয়েছে এক আভিজাত্যের ও কোটি টাকার বাণিজ্যে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০২২ সালের নতুন নীতিমালা (যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর) অনুযায়ী, অভিজাত বনানী কবরস্থানে মাত্র পনেরো বছরের জন্য একটি কবরের জায়গা সংরক্ষণ করতে হলে সরকারি ফি হিসেবে দিতে হয় এক কোটি টাকা। আর পঁচিশ বছরের জন্য এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে এই হার যথাক্রমে পঁচাত্তর লাখ এবং এক কোটি টাকা। উত্তরার অন্যান্য সেক্টরগুলোতেও অবস্থানভেদে ত্রিশ লাখ থেকে পঁচাত্তর লাখ টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পনেরো বছরের জন্য বিশ লাখ এবং পঁচিশ বছরের জন্য ত্রিশ লাখ টাকা গুনতে হয়। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে এই ফি দশ থেকে পনেরো লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কাগজে-কলমে এই ফি নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। তথ্য বলছে, বনানী কবরস্থানের মতো জায়গায় একটি কবর পঁচিশ বছর ধরে রাখতে আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে টাকার অঙ্ক ক্ষেত্রবিশেষে সাড়ে চার কোটি টাকা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। যাদের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য নেই, তাদের স্বজনদের দুই বছর পরই চিরতরে হারিয়ে যেতে হয় মাটির অন্ধকারে। সংরক্ষিত কবরে পরবর্তীতে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যকে দাফন করতে হলেও গুনতে হয় মোটা অঙ্কের ফি। বনানীতে এই পুনর্দফনের ফি পঞ্চাশ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য গোরস্তানে তা ত্রিশ হাজার ৫০০ টাকা। তবে এই সুযোগ সবার জন্য নয়; নীতিমালায় এটি কেবল মৃত ব্যক্তির স্বামী, স্ত্রী, বাবা, মা, ভাই, বোন এবং ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কঠোরভাবে সীমিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন গোরস্তানগুলোতে স্থায়ীভাবে জায়গা কেনার কোনো সুযোগই আর অবশিষ্ট নেই। সেখানে মেয়াদভেদে দশ থেকে পঁচিশ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণে পাঁচ লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিশ লাখ টাকা পর্যন্ত ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মাত্রাতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন চরম অসহায়ত্বের শিকার হচ্ছেন। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা আবু রায়হানের গল্পটি এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। তিন বছর আগে তার খালু আব্দুল আলী মারা গেলে পরিবারের ইচ্ছা ছিল তাকে ঢাকার স্থানীয় কোনো কবরস্থানে দাফন করার। যেহেতু আত্মীয়স্বজনের বেশির ভাগই ঢাকায় বসবাস করেন, তাই এখানে দাফন হলে সবাই সহজেই কবর জেয়ারত করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু তাদের সেই মানবিক আশা পূরণ হয়নি। কবর সংরক্ষণের জন্য কোটি টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য সেই পরিবারের ছিল না। দুই বছর পর প্রিয়জনের কবর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে—এই কষ্ট মেনে নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তারা আব্দুল আলীর মরদেহ ঢাকা থেকে সুদূর কুষ্টিয়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দাফন করতে বাধ্য হন।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কবর সংরক্ষণের এই ব্যয় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে গাণিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরনো নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালেও বনানী ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় স্থায়ীভাবে কবরের জায়গা কিনতে খরচ হতো মাত্র এক লাখ কুড়ি হাজার টাকার মতো। মিরপুরের মতো জায়গায় এটি ছিল পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার মধ্যে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোটামুটি এই ব্যবস্থাই চলমান ছিল। এরপর জায়গার সংকট তীব্র হতে শুরু করলে ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কবরের জায়গা বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০০৮ সাল থেকে নতুন করে মেয়াদভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ২০২৩ সালে নতুন নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বনানীতে পনেরো বছরের জন্য সর্বোচ্চ ফি ছিল চব্বিশ লাখ এবং পঁচিশ বছরের জন্য পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকা। কিন্তু নতুন নীতিমালায় তা এক লাফে এক থেকে দেড় কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও অতীত।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য এই অস্বাভাবিক ফি বৃদ্ধির পেছনে নিজেদের মতো করে একটি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের দাফনের খরচ তারা বাড়াননি; উচ্চ ফি ধার্য করা হয়েছে কেবল দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি হলো, শহরের সীমিত জায়গার কারণে সবাই যদি কবর সংরক্ষণ করতে শুরু করে, তবে অচিরেই ঢাকায় নতুন মৃতদেহ দাফন করার মতো এক ইঞ্চি জমিও আর অবশিষ্ট থাকবে না। মূলত মানুষকে দীর্ঘ মেয়াদে কবর সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করার জন্যই এই উচ্চ ফি-র কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নীতিমালায় বিশেষ সম্মানজনক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তালিকায় নাম থাকা সাপেক্ষে প্রথম দশ বছর তারা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে কবর সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে থাকেন এবং মিরপুরে তাদের জন্য প্রায় দেড় একর জমি আলাদাভাবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
কিন্তু এসব যুক্তির আড়ালে ঢাকা শহরের কবরস্থান ব্যবস্থাপনার মূল সংকটগুলো রয়েই গেছে। জায়গার অভাবে বনানীর মতো গোরস্তানে সংরক্ষিত কবরে পরিবারের একাধিক সদস্যকে দাফন করতে গিয়ে একটি কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করার নজির তৈরি হয়েছে। অতীতে কবরস্থানের জায়গা নিয়ে নানামুখী ছিনিমিনি খেলার ঘটনাও ঘটেছে। ২০০৬ সালে আজিমপুর গোরস্তানের শতাধিক কবর ভেঙে রাস্তা নির্মাণের এক আত্মঘাতী উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত সিটি করপোরেশন। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ইন্ধনে নেওয়া সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে বেআইনি ঘোষিত হয়ে বন্ধ হয়। বিভিন্ন সময়ে গোরস্তানের দুর্নীতি নিয়ে খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা সেই অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজ চক্র আর অসাধু কর্মচারীদের যোগসাজশ আজও ভাঙা সম্ভব হয়নি। জীবনের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য আর বঞ্চনার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষটি যখন মৃত্যুর পর একটু শান্তির আশায় মাটির নিচে আশ্রয় নেয়, সেখানেও তাকে ঘিরে চলে এক অন্তহীন ও নির্মম বাণিজ্য।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ