• রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন

অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য: দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর যে চিত্র জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তা কেবল একটি বার্ষিক পরীক্ষার নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি আমাদের পুরো জাতীয় শিক্ষা কাঠামোর গভীরে জমে থাকা এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংকটের নির্মম প্রতিচ্ছবি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ১২ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ছয় লাখ পরীক্ষার্থীই চূড়ান্তভাবে অকৃতকার্য হয়েছে, যার সহজ অর্থ দাঁড়ায় যে প্রতি দুজন শিক্ষার্থীর একজনই এই বৈতরণী পার হতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ঠিক এই একই শিক্ষার্থীরা যখন বিগত ২০২৪ সালে মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তখন তাদের পাসের হার ছিল চমকপ্রদভাবে ৮৩ শতাংশের কাছাকাছি এবং রেকর্ড সংখ্যক ১ লাখ ৮২ হাজার শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একই মানবসম্পদের এমন নাটকীয় পতন কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

মাত্র দুই বছরের এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মেধা বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা রাতারাতি অর্ধেকে নেমে আসার কোনো বাস্তব ভিত্তি থাকতে পারে না। সুতরাং দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এটি বলা যায় যে এই বিপর্যয়ের মূল কারণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অযোগ্যতা নয়, বরং জাতীয় মূল্যায়ন ও খাতা দেখার পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ত্রুটি ও অসঙ্গতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার লক্ষাধিক শিক্ষার্থী তাদের উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়নের জন্য আবেদন করার নজির স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে সেই খাতাগুলো পুনরায় যাচাই করার পর দেখা যায় যে ৫৬ হাজারেরও বেশি উত্তরপত্রের প্রাপ্ত নম্বরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে ইতিপূর্বে ফেল করা ৪ হাজার ৫৮৫ জন শিক্ষার্থী নতুন করে পাস করেছে এবং আরও প্রায় চারশ জন শিক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। একই উত্তরপত্র অথচ দ্বিতীয়বার মূল্যায়নের টেবিলে যাওয়ার পর ফলাফল সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার এই চিত্র প্রমাণ করে যে খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।

পরিসংখ্যানের গভীর বিশ্লেষণ করলে এই বিপর্যয়ের আরও ভয়ংকর রূপ নজরে আসে। তিন বছর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতি দশজন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় আটজনই সফলতার সঙ্গে পাস করেছিল। কিন্তু বর্তমান ২০২৬ সালের এই ফলাফল বলছে যে প্রতি দশজনে পাস করেছে মাত্র পাঁচজন আর বাকি পাঁচজনই খাদের কিনারায় ছিটকে পড়েছে। চলতি বছর মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন, যার ফলে সামগ্রিক পাসের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। কেবল তাই নয়, দেশের প্রায় ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যা কোনো সাধারণ ফলাফল বিপর্যয় নয় বরং দেশের শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি লাল বাতি জ্বালানো সতর্কবার্তা। যেসকল প্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়, সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সক্ষমতা, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের পাঠদানের মান এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে আজ বড় প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

শিক্ষাঙ্গনে এই ধস নামার পেছনে কেবল পরীক্ষার্থীদের দুষলে কোনো লাভ নেই, কারণ শিক্ষার মান মূল্যায়নের একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া থাকা উচিত। পরীক্ষার টেবিলে যদি কেবল একজন শিক্ষার্থীর মেধা ও খাতার লেখা যাচাই করা হয়, তবে একই সঙ্গে সেই শিক্ষার্থীকে পড়ানো শিক্ষক, স্কুল বা কলেজের পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষা প্রশাসন এবং নীতিনির্ধারকদেরও কঠোর মূল্যায়নের মুখোমুখি হওয়া আবশ্যক। চলতি বছরের ফলাফলে দেখা গেছে যে কেবল ইংরেজি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বা আইসিটির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলোতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজারের অধিক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই আঙুল তোলে। আমাদের কলেজগুলোতে কি পর্যাপ্ত পরিমাণ বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক রয়েছেন? নিয়মিত ও মানসম্মত ক্লাস কি অনুষ্ঠিত হয়? আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর মতো পর্যাপ্ত ল্যাব, কম্পিউটার ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা কি প্রতিটি মফস্বল কলেজে নিশ্চিত করা গেছে? যদি এর উত্তর না-বোধক হয়, তবে সেই ব্যর্থতার দায়ভার একা শিক্ষার্থীর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার কোনো অধিকার কর্তৃপক্ষের নেই।

যে শিক্ষকের ক্লাসের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করে, সেই শিক্ষকের পাঠদানের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি নৈতিকভাবে জরুরি নয়? একইভাবে যে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বা ব্যবস্থাপনা পর্ষদ শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম পাসের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন, তাদের প্রশাসনিক দায় কোথায় নির্ধারিত হবে? যে শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের অর্ধেক তরুণ প্রজন্মকে সফলভাবে পাশ করাতে পারে না, সেই পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার নিজেরই প্রকৃত পাস মার্ক কত, তা আজ জাতির সামনে খতিয়ে দেখা দরকার। এই ভয়াবহ ফলাফলের মানসিক ধাক্কা মূলত বহন করতে হচ্ছে দেশের কোমলমতি তরুণ ও কিশোরদের। যারা আজ কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে ঘরে বসে আছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলা দরকার যে একটিমাত্র পরীক্ষার ফলাফল বা একটি মার্কশিট মানুষের পুরো জীবনের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে ওই শিক্ষার্থী বুদ্ধিহীন, অযোগ্য কিংবা তার জীবনের সমস্ত সম্ভাবনার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

পরীক্ষায় খারাপ করার পেছনে নানা বাস্তব কারণ থাকতে পারে; যেমন সঠিক নির্দেশনার অভাব, প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময়ের ঘাটতি, পারিবারিক বা মানসিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তাই ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভেঙে না পড়ে নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর জেদ তৈরি করতে হবে। এক বা দুই বিষয়ে হোঁচট খাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সরকার ইতিমধ্যে বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ রাখার ঘোষণা দিয়েছে এবং উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ করার নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারিত রয়েছে। অভিভাবকদের জন্যও এই বার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, এই কঠিন সময়ে সন্তানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে বা কটু কথা শুনিয়ে মানসিকভাবে আরও বেশি বিপর্যস্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্তানের রেজাল্ট কার্ডের চেয়ে তার মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। সমাজের সব মানুষকে একই ট্রাকে দৌড়াতে হবে এমন কোনো কথা নেই, জীবনের প্রতিটি বাঁকে নতুন পরীক্ষা আসে এবং ব্যর্থতাকে জয় করে যারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, প্রকৃত সফলতার মুকুট তাদেরকেই মানায়।

পরিশেষে এই করুণ ও উদ্বেগজনক ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সমগ্র শিক্ষা প্রশাসনকে কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। শুধু পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করলেই চলবে না, বরং শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা, শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি। যারা এ বছর সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছ তাদের জন্য রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অভিনন্দন, আর যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পাওনি তারা হতাশ না হয়ে নতুনভাবে জীবনের লড়াই শুরু করো কারণ ভবিষ্যৎ কেবল একটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category