জাতীয় গ্রিডে ক্রমবর্ধমান গ্যাস ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার নতুন নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের দিকে ঝুঁকলেও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা একে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। সরকারের পক্ষ থেকে মহেশখালীতে তৃতীয় টার্মিনাল নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়ার পাশাপাশি পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট গবেষক ও ভূতাত্ত্বিকদের সুস্পষ্ট মত—ব্যয়বহুল আমদানির এই অন্তহীন চক্র দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর চাপের মুখে ফেলবে। বরং সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র টেকসই পথ হলো দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত রিগ সংগ্রহ এবং নিছক দ্বিমাত্রিক (টুডি) অনুমানের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) সিসমিক জরিপ পরিচালনা করা।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে প্রথম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি শুরুর পর বিগত আট অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের চড়া মূল্যের চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হয়েছে। বর্তমানে কার্যকর থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনাল পরিচালনায় দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ডলারের মতো চড়া ভাড়া দিতে হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যেখানে আমদানিতে ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, আট বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে এখন বার্ষিক ৬০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। নতুন টার্মিনালগুলো চালু হলে আমদানি ব্যয়ের এই বহর দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ ভোক্তাদের গ্যাস বিলের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে।
আমদানির বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলার চলমান ৫০টি কূপ খনন কর্মসূচির আওতায় বহু এলাকায় খননকাজ চালিয়েও আশানুরূপ গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়নি। জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, অতীতের সেকেলে টুডি সিসমিক সার্ভে বা দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে খননকাজ পরিচালনা করায় এমন ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। দ্বিমাত্রিক পদ্ধতিতে মাটির নিচের স্তরের সাধারণ রেখাচিত্র পাওয়া গেলেও সেখানে বাণিজ্যিক গ্যাসের উপস্থিতি ও মজুতের প্রকৃত পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যায় না। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কূপ খননের পর অনেক কূপে গ্যাসের কোনো সন্ধান মেলেনি, আবার কিছু কূপে শুরুতে উৎপাদন হলেও তা দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৬৪৩ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক জরিপ সম্পন্ন হলেও আধুনিক ত্রিমাত্রিক জরিপ করা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ১৩৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায়। দীর্ঘ দুই যুগে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি কোম্পানির অধীনে কূপ খনন ও জরিপ বাবদ মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকার মতো সীমিত অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা আমদানির খরচের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের হাতে বর্তমানে মাত্র পাঁচটি কার্যকর রিগ রয়েছে, যা দেশের পাহাড়ি এলাকা, চরাঞ্চল ও গভীর স্তরে বিস্তৃত খননকাজ চালানোর জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, উন্নত ডেটা অ্যাকুইজিশন, প্রসেসিং ও ত্রিমাত্রিক জরিপের মাধ্যমে নিশ্চিত মজুত চিহ্নিত না করে হুটহাট কূপ খনন করার প্রবণতা সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।
সম্প্রতি সাগরের এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশের শিল্প-কারখানা ও আবাসিকে যে তীব্র জ্বালানি খরা তৈরি হয়েছিল, তা আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার চরম ভঙ্গুরতাকে উন্মোচিত করেছে। এই বাস্তবতায় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নতুন নতুন টার্মিনাল ও অবকাঠামো তৈরির পেছনে দৌড়ানোর চেয়ে বাপেক্সের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে থ্রিডি জরিপের পরিধি বাড়ানো এবং অত্যাধুনিক ডিপ ড্রিলিং বা গভীর খনন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করাই এখন জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে একমাত্র কার্যকর কৌশল।