বছরে শত শত কোটি টাকার আর্থিক লোকসান, রিমোটের বোতামে দর্শকের চরম অনীহা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি| দর্শকসংখ্যা যখন মোট টেলিভিশন দর্শকের দুই শতাংশেরও নিচে এবং আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বোঝা বত্রিশ গুণ বেশি, ঠিক সেই চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটি ঘোষণা দিয়েছে তারা নতুন রূপে ফিরতে চায়| গত ৩০ আগস্ট রোববার রাতে বিটিভি তাদের পর্দায় জানান দেয় যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে| কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই রূপান্তর কি কেবল বাইরের লোগো বা প্রতীক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি শতকোটি টাকার পুঞ্জীভূত আর্থিক ক্ষত ঢাকতে কয়েক কোটি টাকার মেকআপ বা চোখভোলানো প্রচারমাত্র| ভেতরের পচন ও মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে অক্ষত রেখে কেবল দৃষ্টিনন্দন প্রতীক পরিবর্তন করে কি একটি মৃতপ্রায় গণমাধ্যমকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব|
আর্থিক খতিয়ান মেলালে বিটিভির রক্তক্ষরণের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়ংকর রূপে ধরা পড়ে| জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রীর উত্থাপিত আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, গত এগারো মাসে অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বিটিভির নিজস্ব আয় হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ৫ লাখ টাকা| এর বিপরীতে এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় করেছে ২৫৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা| ফলে মাত্র এগারো মাসেই রাষ্ট্রায়ত্ত এই সম্প্রচারমাধ্যমের আর্থিক লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৪৬ কোটি ১৩ লাখ টাকায়| এটি কোনো এক বছরের আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিগত অর্ধদশক ধরে নিয়মিত লোকসানের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে| ২০২০-২১ অর্থবছরে লোকসান ছিল ২৪৬ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৪৫ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৩৯ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৫৪ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছিল ২৮০ কোটি টাকা| অথচ ২০০৩-০৪ অর্থবছরেও বিটিভি ৫২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছিল| ২০১০ সালেও যে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিজ্ঞাপন আয় ছিল ১১৭ কোটি টাকা, চলতি বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ৫ কোটি ৭ লাখ টাকায়| দর্শক হারিয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞাপনদাতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, আর বিজ্ঞাপন না থাকায় জাতীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃত্রিমভাবে এই প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে|
এমআরবি বাংলাদেশের দর্শক জরিপের দিকে তাকালে বিটিভির জনপ্রিয়তার করুণ দশা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে| জরিপ অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার দর্শকেরা তাদের টিভি দেখার মোট সময়ের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় করেন বিদেশি চ্যানেল উপভোগে| অবশিষ্ট যে ৩০ শতাংশ সময় তারা দেশীয় টিভি চ্যানেলের পেছনে দেন, তার মধ্যে বিটিভির ভাগ্যে জোটে মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ সময়| ২০১০ সালেও যেখানে বিটিভির দর্শক হিস্যা ছিল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ, তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে| দর্শক না থাকার কারণ খুঁজতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের প্রশাসনিক ও সৃজনশীল দেউলিয়াত্ব নজরে আসে| বিটিভিতে ১ হাজার ৬৬৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৪০৪টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে, যার মধ্যে ১৫২টিই প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার পদ| ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এখানে কোনো উন্মুক্ত বা সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষা হয়নি| নিজস্ব নিয়মে এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে গণহারে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, এমনকি স্নাতক পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ব্যক্তিও প্রভাব খাটিয়ে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা বনে গেছেন| স্বাধীনতার পর থেকে আসা ৩৫ জন মহাপরিচালকের মধ্যে নিজস্ব গণমাধ্যম পেশাজীবী ছিলেন মাত্র পাঁচজন, আর বাকি ৩০ জনই ছিলেন সাধারণ আমলা, যাদের গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা কিংবা আধুনিক টেলিভিশন প্রযোজনার বিষয়ে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা দূরদর্শিতা ছিল না| ফলে সৃজনশীলতার বদলে প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক তল্পিবাহক প্রচারযন্ত্রে রূপ নেয়| খবরের বুলেটিন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের বন্দনায় পুরো সময় ব্যয় করা হলেও বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের সংকটের কোনো প্রতিফলন সেখানে থাকে না| এমনকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিয়মিত স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে যাওয়া কিংবা শব্দের মান ভেঙে পড়ার মতো সাধারণ কারিগরি জটিলতাও নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে|
এমন জরাজীর্ণ বাস্তবতায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করে লোগো বদলের উদ্যোগকে আধুনিক বিজ্ঞাপনী ভাষায় ‘রিব্র্যান্ডিং অ্যাজ এ ডিকয়’ বা দৃষ্টি সরানোর ছদ্মবেশী কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা| অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধানের সৎসাহস না থাকলে বাইরে বাহ্যিক পরিবর্তন এনে পরিবর্তনের একটা ভুয়া আবহ তৈরি করা হয়| অথচ যে লোগোটি পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার গভীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য| ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বরেণ্য শিল্পী ইমদাদ হোসেনের আঁকা প্রাথমিক স্কেচে নজর বুলিয়েছিলেন পটুয়াশিল্পী কামরুল হাসান| পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে সেটিকে রঙিন রূপ দেন খ্যাতনামা পাপেট ও নাট্যব্যক্তিত্ব মোস্তফা মনোয়ার এবং ওই বছরের ১ ডিসেম্বর রঙিন সম্প্রচারের সঙ্গে এই লাল-সবুজ প্রতীকের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান| মুক্তিযুদ্ধের তিনজন কালজয়ী শিল্পী এবং একজন রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর সংবলিত এই প্রতীক নিছক একটি নকশা নয়, এটি জাতীয় ইতিহাসের এক অবিনাশী স্মারক| কিন্তু বিগত দেড় দশকে রাজনৈতিক অতি-ব্যবহারের কারণে এই লাল-সবুজ প্রতীকটি সাধারণ মানুষের স্মৃতিতে ‘জিয়াবন্দী’ ঐতিহাসিক স্মারক থেকে কোনো নির্দিষ্ট সরকারের একপেশে প্রচারযন্ত্রের সমার্থক হয়ে উঠেছিল| বর্তমান সরকারের সামনে বিকল্প ছিল দুটি—হয় আগামী কয়েক বছর মেধা ও স্বাধীন কনটেন্ট দিয়ে দর্শকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, নয়তো চটজলদি লোগো বদলে দিয়ে একটা পরিবর্তনের নাটক তৈরি করা| তারা আপাতদৃষ্টে দ্বিতীয় সহজ ও সস্তা পথটিই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে|
বিশ্ব গণমাধ্যমের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, কেবল লোগো বদলে কোনো গণমাধ্যম পুনর্জীবন পায়নি| ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বা বিবিসি তাদের শতবর্ষের ইতিহাসে পাঁচবার লোগো পরিবর্তন করলেও তারা টিকে রয়েছে তাদের সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতার জোরে| জাপানের এনএইচকে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত তাদের অর্থনৈতিক মডেল এবং মানুষের দেওয়া লাইসেন্স ফির মাধ্যমে, যেখানে কোনো সরকারি অনুদানের মুখাপেক্ষী হতে হয় না| কিন্তু বিটিভি বরাবরই হেঁটেছে উল্টো পথে| ২০১৫ সালে চীন থেকে ১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পাঁচটি নতুন আঞ্চলিক কেন্দ্র খোলার বিলাসী প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, অথচ ৬৫ কোটি টাকায় নির্মিত চট্টগ্রাম কেন্দ্র দিনে মাত্র দেড় ঘণ্টা প্রচার চালাতে পারে এবং খুলনা কেন্দ্র উদ্বোধনের আগেই যন্ত্রপাতি খুলে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিটিভি বাঁচাতে হলে লোগো নয়, দরকার চারটি জরুরি মৌলিক অস্ত্রোপচার| প্রথমত, নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়ন করে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে বের করে বিটিভিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা| দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ভিত্তি বদলাতে লাইসেন্স ফি চালু করা এবং বিগত ৬০ বছরের সমৃদ্ধ আর্কাইভ নিয়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে হুমায়ূন আহমেদের নাটকসহ সোনালী অতীতের নাটক ও গান দর্শকেরা অর্থের বিনিময়ে দেখার সুযোগ পাবেন| তৃতীয়ত, শূন্য পদগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের মেধাবী তরুণদের নিয়োগ দেওয়া এবং শিল্পীদের সম্মানী অন্তত দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া| চতুর্থত, সংবাদকে পুরোপুরি মুক্ত ও স্বাধীন করে দেওয়া, যাতে সত্য তুলে ধরার স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়|
লোগো বদলাতে হয়তো কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হবে এবং মাত্র দশ দিন সময় লাগবে, কিন্তু একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অন্তত দশ বছর নিরবচ্ছিন্ন সততা ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজন| বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক কাজী জেসিন অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন যে লোগো বদলের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, বরং মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখতেই এটি একটি প্রাথমিক যাচাই ছিল| বিটিভির লাল-সবুজ আয়তাকার জানালা দিয়ে একসময় দেশের সাধারণ মানুষ বাংলাদেশকে দেখতে পেত, আর আজ সেই জানালা এতটাই অন্ধকার ও ধূলিমলিন যে মানুষ সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে| দেয়াল তুলে দিয়ে ইতিহাস আর স্মৃতি মুছে ফেলার চেয়ে সেই জানালার কাচ পরিষ্কার করে সত্য ও সৃজনশীলতার আলো ঢুকতে দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ|
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস২৪