রাজধানীর কোনো এক আবাসিক এলাকার গলিপথ চিরে বিকট শব্দে ধেয়ে চলছে সিটি কর্পোরেশনের ফগিং মেশিনবাহী ট্রাক| পেছনের দীর্ঘ নল বেয়ে চারপাশ ঢেকে দিচ্ছে ঘন কুয়াশাতুল্য কালো বিষাক্ত ধোঁয়া| তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে পথচারীদের চোখ জ্বলে যায়, সাধারণ নাগরিক ভাবেন প্রশাসন হয়তো এডিস মশা নিধনে জোরেশোরেই নেমেছে| কিন্তু এই দৃশ্যমান মহড়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নিষ্ঠুর তামাশা| যে কক্ষে কোনো ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর প্লাটিলেট আশঙ্কাজনকভাবে বিশ হাজারে নেমে গিয়ে জীবন-মৃত্যুর টানাটানি চলছে, সেই ঘরের মশাগুলো এই ধোঁয়ায় সামান্যতম কাবু হয় না| কারণ সাড়ে তিন হাজার টাকার মোড়কে বোতলজাত সেই তরলে আসলে মিশে থাকে মাত্র কয়েকশ টাকার অকার্যকর ভেজাল উপাদান| আর যে জংধরা যন্ত্র দিয়ে পুরো শহরে এই ধোঁয়ার নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে তা বাতিল ঘোষিত হয়েছে অর্ধশতক আগেই| গত পাঁচ বছরে ঢাকার নাগরিকরা মশক নিধনের নামে ট্যাক্স দিয়েছেন ৫২৮ কোটি টাকা, কিন্তু বিনিময়ে নগরবাসী পেয়েছে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের হাহাকার আর প্রিয়জন হারানোর সীমাহীন ক্ষত|
মশক নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ডেঙ্গু দমনে দরকার দ্বিমুখী কার্যকর ব্যবস্থা—লার্ভিসাইডিং বা ডিম ও লার্ভা ধ্বংসের উপযুক্ত জীবাণুনাশক এবং এডাল্টিসাইডিং বা উড়ন্ত পূর্ণাঙ্গ মশা মারার নিখুঁত ওষুধ| বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বহু আগেই সতর্ক করেছে যে, লার্ভা ধ্বংসের জন্য সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ও অব্যর্থ সমাধান হলো বিটিআই নামক এক ধরণের বিশেষ ব্যাকটেরিয়া| অথচ রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ‘টেমেফস’ নামক এক মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক ছিটিয়ে গেছে, যার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের আগেই মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়| তৎকালীন মেয়র প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে ওষুধ কাজ করছে না| এরপর ২০২৩ সালে নতুন করে বিটিআই আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানেও চলে জালিয়াতির মহোৎসব| সিঙ্গাপুরের নাম ভাঙিয়ে চীন থেকে নিম্নমানের আমদানি করা ভেজাল পণ্য সরবরাহের দায়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত কালো তালিকাভুক্ত হয় এবং থানায় মামলাও ঠেকে| কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও সেই পুরনো প্রতারণার চক্র থামেনি| উত্তর সিটি এখন পুনরায় বিশ কোটি টাকার ওষুধ কেনার নথি চালাচালি করছে আর তাদের টেকনিক্যাল কমিটি অর্ধশতক পর এখনো বৈঠক করে যাচ্ছে মশা কোন ওষুধে মরে তা নির্ধারণ করতে|
কাগজে-কলমে আধুনিক কীটনাশক ও শতকোটি টাকার বরাদ্দের পরিসংখ্যান দেখানো হলেও মাঠের বাস্তবতা চরম উদ্বেগজনক| দক্ষিণ সিটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, রাজধানীর প্রায় ৬০ শতাংশ বাসাবাড়িতেই এখন এডিসের লার্ভার অবাধ বংশবৃদ্ধি ঘটছে| পুরো ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ড সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত, যার মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডের পরিস্থিতি চরম আশঙ্কাজনক| অথচ দক্ষিণ সিটিতে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট সাড়ে তিন গুণ বাড়িয়ে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা করা হয়েছে| হাজার কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ব্যয়ের পরও ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণে আসেনি| চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার হাজার ৪৪ জনের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং প্রাণহানি ছাড়িয়েছে ১১১ জনে| অথচ গত বছর চালু হওয়া রঙচঙে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড কেবল আমলাতান্ত্রিক প্রচারণাই বাড়িয়েছে, মাঠপর্যায়ে কোনো কাজ করেনি| আগে কমদামি রাসায়নিকের নামে যেমন সাধারণ পানি ছিটানো হতো, এখন বিটিআইয়ের ব্যানারে আরও বেশি দামের ভেজাল পানি ছিটানোর মহোৎসব চলছে|
এই অচলাবস্থার মূলে রয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাত| গত সাত বছরের দরপত্রের নথি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঘুরেফিরে মাত্র তিনটি কোম্পানির মধ্যেই পুরো কেনাকাটা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে| এদের কারও আন্তর্জাতিক মানসনদ নেই এবং তৃতীয় কোনো নিরপেক্ষ ল্যাব টেস্টের প্রমাণপত্রও নেই| ঠিকাদারদের নিজস্ব নথিতে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার বানোয়াট সনদ থাকলেও আইসিডিডিআর,বি-র ফিল্ড ট্রায়ালে দেখা গেছে এর কার্যকারিতা মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি নয়| মূল্যের ক্ষেত্রে চলে হরিলুট; খোলাবাজারে যে ডেল্টামেথরিনের প্রতি লিটারের দাম সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা, সিটি কর্পোরেশন দরপত্রে তা কিনেছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়| অর্থাৎ প্রতি লিটারেই অন্তত আড়াই হাজার টাকা লুটপাট হয়েছে| এভাবে হাজার হাজার লিটার ভেজাল ওষুধ কিনে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে| এমনকি বিভিন্ন ওয়ার্ডের স্টোররুমে ২০২২ সালে কেনা বহু মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক বস্তাবন্দী অবস্থায় রোদে-গরমে নষ্ট হচ্ছে, যা পরবর্তীতে পানিতে গুলে লোকদেখানো ড্রেনে ফেলে দেওয়া হয়|
কীটনাশকের পাশাপাশি যন্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছে ভয়াবহ দুর্নীতি| এডিস মশা ধ্বংস করতে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে ‘আল্ট্রা লো ভলিউম’ বা ইউএলভি প্রযুক্তির মেশিন ব্যবহার করা হয়, যা কোনো কালো ধোঁয়া ছড়ায় না বরং অতি সূক্ষ্ম কুয়াশা তৈরি করে ঘরের কোনায়, খাটের নিচে ও জানালার ফাঁকে পৌঁছে উড়ন্ত মশা ধ্বংস করে| এ ধরণের দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রের দাম সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা হলেও সিটি কর্পোরেশন মাত্র ৭০ হাজার টাকায় পুরনো প্রযুক্তির হ্যান্ড ফগার কেনে| এই হ্যান্ড ফগার ডিজেল পুড়িয়ে ভারী কালো ধোঁয়া ছাড়ে, যা ঘরের উচ্চতায় বা অভ্যন্তরে প্রবেশ না করে কেবল রাস্তার পিচেই মিলিয়ে যায়| বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্র কিনলে তা এক দশকেও নষ্ট হয় না, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সস্তা ও ক্ষতিকর যন্ত্র কেনা হয় যাতে প্রতি বছর যন্ত্র বিকল হয়, নতুন দরপত্র আহ্বান করা যায় এবং নতুন কমিশন হাতিয়ে নেওয়া যায়| তদুপরি এডিস মশা যখন কামড়ায়—সকাল নয়টা থেকে এগারোটা এবং বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা—সেই উপযুক্ত সময় বাদ দিয়ে ধোঁয়া ওড়ানো হয় ভর সন্ধ্যায়, কেবল পথচারীদের চোখে ধুলো দিয়ে কাজ দেখানোর অসদুপায়ে|
মাঠপর্যায়ের নজরদারিতে জনবলের অভাবকে এক চরম হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে| দুই সিটি কর্পোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে স্থায়ী মশক নিধন কর্মী রয়েছে মাত্র চার শতাধিক, যার অর্থ ওয়ার্ডপ্রতি মাত্র তিনজন স্থায়ী কর্মী| বাকি ৭০ শতাংশ কর্মীই নামমাত্র দৈনিক পাঁচশ টাকার মজুরিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আনা, যাদের লার্ভা শনাক্তের কোনো মৌলিক প্রশিক্ষণ নেই| একজন কর্মীকে দিনে একশটি বাড়ি পরিদর্শনের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়, যা বাস্তবে প্রায় ১৬ ঘণ্টার কাজ| ফলে কর্মীরা সরেজমিনে না গিয়ে ঘরে বসেই কাল্পনিক তথ্য দিয়ে ভুয়া রিপোর্ট প্রস্তুত করেন| পুরো দুই সিটিতে দুজন কীটতত্ত্ববিদের অনুমোদিত পদের বিপরীতে একজনও চার বছর ধরে দায়িত্বে নেই, অর্থাৎ সেনাপতি ছাড়াই চলছে এই তথাকথিত মশক যুদ্ধ| সিঙ্গাপুরে যেখানে প্রতি দশটি বাড়িতে মশার ডিম পাড়া শনাক্তে ‘ওভিট্র্যাপ’ যন্ত্র বসানো থাকে, ঢাকায় তার একটিও নেই; কারণ সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য জনসমক্ষে এলে বাজেটের শুভঙ্করের ফাঁকি প্রকাশ হয়ে পড়বে|
প্রশাসনিক এই পক্ষপাতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে জরিমানার বৈষম্যে| বিগত বছরে লার্ভা রাখার দায়ে সাধারণ নাগরিকদের প্রায় বারো হাজার ভবনকে জরিমানা করা হলেও নির্মাণাধীন অবকাঠামোয় অভিযানের হার ছিল চোখে পড়ার মতো নগণ্য| অথচ আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ এডিসের লার্ভা জন্মায় রিয়েল এস্টেট ও বহুতল ভবনের জমে থাকা পানিতে| প্রভাবশালী বিল্ডারদের বেসমেন্টে জমে থাকা হাজার লিটার পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল মধ্যবিত্তের ঘাড়ে জরিমানার খড়্গ নামিয়ে আনা হয়| জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট অভিমত, ডেঙ্গু কোনো প্রাকৃতিক মহামারি নয়, এটি সম্পূর্ণভাবে আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি| উড়ন্ত এডিস মশা চারশ মিটারের বেশি উড়তে পারে না এবং এর জন্ম আমাদের আশেপাশেই| নগরবাসী যদি সিটি কর্পোরেশনের এই প্রতারণামূলক ধোঁয়ার আশায় বসে না থেকে নিজেদের ঘরের ফুলের টব, এসির পানি আর বাথরুমের পাত্রগুলো নিজ উদ্যোগে নিয়মিত পরিষ্কার রাখেন, তবেই হাজার কোটি টাকার এই অর্থহীন লুটেরা চক্র থেকে নাগরিক জীবনকে রক্ষা করা সম্ভব|