মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত মার্কিন অবরোধ কেবল তেহরানের নিজস্ব নৌযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বিশ্বের যেকোনো দেশের পতাকাবাহী জাহাজের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম সমানভাবে কার্যকর করা হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। বুধবার (১৫ এপ্রিল) এক বিশেষ বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সেন্টকমের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।
অবরোধের পরিধি: ইরানের উপকূলীয় এলাকা বা কোনো বন্দরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা কিংবা সেখান থেকে পণ্য নিয়ে বেরিয়ে আসা—যেকোনো জাহাজকেই পথিমধ্যে আটকানো হবে।
সামরিক প্রস্তুতি: মোতায়েনকৃত প্রতিটি ডেস্ট্রয়ারে ৩০০-এর বেশি প্রশিক্ষিত নাবিক রয়েছেন। তারা কেবল নজরদারি নয়, বরং আক্রমণাত্মক এবং প্রতিরক্ষামূলক উভয় ধরনের অভিযানে সমানভাবে পারদর্শী। এর মানে দাঁড়ায়, কোনো জাহাজ যদি মার্কিন নির্দেশ অমান্য করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে।
একদিকে সমুদ্রের বুকে যুদ্ধের দামামা বাজছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা। প্রথম দফা ইসলামাবাদ বৈঠক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর এখন দ্বিতীয় দফা সংলাপের দিনক্ষণ ও স্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বার্তা সংস্থা রয়টার্স পাকিস্তানের ইরানি দূতাবাসের বরাতে নিশ্চিত করেছে যে, দ্বিতীয় দফা বৈঠক খুব শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফও জানিয়েছেন, সরাসরি আলোচনার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে গোল বেধেছে বৈঠকের স্থান নিয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেন্যু নির্বাচন নিয়ে এই টানাপোড়েন মূলত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ।
ইসলামাবাদ: ইরান এখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও যুক্তরাষ্ট্র চায় এমন এক জায়গায় বসতে যেখানে পশ্চিমা প্রভাব বেশি।
জেনেভা: দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে এটি সেরা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত বৈঠকের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি কোনো স্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
তুরস্ক ও মিশর: এই দুটি দেশই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের মধ্যস্থতায় এর আগেও বড় বড় আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধান হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘টোটাল ব্লকেড’ বা পূর্ণাঙ্গ অবরোধের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে নতুন করে ৩ থেকে ৫ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, যদি কোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ আটকের ঘটনা ঘটে, তবে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
এই সপ্তাহ বা আগামী সপ্তাহের শুরুতে দ্বিতীয় দফা আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও, মাঠের বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। একদিকে আলোচনার ডাক, অন্যদিকে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ করা—যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ক্যারিট অ্যান্ড স্টিক’ বা ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ নীতি ইরান কতটা সহজভাবে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড ইতিমধ্যে এই অবরোধকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে।