পাকিস্তানের ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক আগ্রাসনের ছক কষতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ঘোষিত নৌ-অবরোধের পাশাপাশি এবার দেশটিতে ‘সীমিত আকারে’ সামরিক হামলা চালানোর বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতোমধ্যে উপদেষ্টাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বেশ কয়েকটি সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনাও সেরেছেন তিনি।
হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সীমিত হামলার পাশাপাশি ইরানে পূর্ণমাত্রার বোমা হামলার বিকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও অস্থিতিশীল করার ঝুঁকির কারণে সেটি আপাতত কম সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া মিত্র দেশগুলোকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার দায়িত্বে যুক্ত করতে চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে একটি অস্থায়ী অবরোধের কৌশলও বিবেচনায় রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের। এরই মধ্যে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি এটা করতে চাই না, কিন্তু তাদের লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট বা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো খুব সহজ লক্ষ্যবস্তু।’ হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ওলিভিয়া ওয়েলসও নিশ্চিত করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অন্যান্য সামরিক বিকল্পের পথও খোলা রেখেছেন।
ভবিষ্যৎ যেকোনো সমঝোতার জন্য ওয়াশিংটন এবার বেশ কয়েকটি অত্যন্ত কঠোর শর্ত বা ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা ও টোল আদায় বন্ধ করা, সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা ভেঙে ফেলা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তার স্বার্থে হিজবুল্লাহ ও হুথি বিদ্রোহীদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সরকারি আয়ের প্রায় অর্ধেকই যেহেতু তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাই নৌ-অবরোধই তাদের ওপর সবচেয়ে কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সামরিক দম্ভের এই কৌশলে বড় ধরনের ঝুঁকিও দেখছেন পেন্টাগনের কর্মকর্তারা। অত্যন্ত সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অবস্থান নেওয়া মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে, দেশের ভেতরেও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরম রাজনৈতিক চাপে পড়তে পারে ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান শিবির।
এত চরম উত্তেজনা ও সামরিক হুমকির পরও কূটনীতির দরজা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইরানি প্রতিনিধি দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য রেজা আমিরি মোগাদাম জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে হওয়া দীর্ঘ আলোচনা একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে, যা পারস্পরিক আস্থা ও সদিচ্ছা থাকলে ভবিষ্যতে একটি কার্যকর কাঠামোতে রূপ নিতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সামরিক অবরোধ ও হামলার হুমকি, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে থাকার এই দ্বিমুখী মার্কিন কৌশল মধ্যপ্রাচ্যকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত যেমন বেধে যেতে পারে, তেমনি আকস্মিক কোনো চুক্তির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।