ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশ্য একই সুতোয় গাঁথা থাকলেও, যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পেরোতেই সেই ঐক্যে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েরই অভিন্ন লক্ষ্য ছিল তেহরানে সরকার পতন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প যেখানে বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকিমুক্ত রেখে খুব দ্রুত একটি সামরিক বিজয় চেয়েছিলেন, সেখানে নেতানিয়াহুর উদ্দেশ্য আরও সুদূরপ্রসারী। গত চার দশক ধরে তিনি যে ইরানি শাসনব্যবস্থার আমূল উৎপাটনের স্বপ্ন দেখছেন, সেটি বাস্তবায়নই এখন ইসরায়েলের প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিত্র এই দুই দেশের মধ্যকার মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে বুধবার ইরানের বিশাল সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার পর। কাতার ও ইরানের যৌথ মালিকানাধীন বিশ্বের বৃহত্তম এই গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল পুরোপুরি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এই হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিল। যদিও একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামলায় সরাসরি অংশ না নিলেও ওয়াশিংটনকে আগেই এই বিষয়ে অবহিত করেছিল তেলআবিব। এদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। কাতার ও সৌদি আরবের মতো মিত্র দেশগুলোতেও আছড়ে পড়ছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিপর্যয়ে ট্রাম্প একদিকে উল্লাস প্রকাশ করলেও বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন অন্য দেশের স্বার্থে বা প্ররোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে হলো। এই চাপের মুখেই ইসরায়েলি লবির প্রভাবের অভিযোগ তুলে চলতি সপ্তাহে পদত্যাগ করেছেন প্রেসিডেন্টের শীর্ষ কাউন্টার-টেরোরিজম কর্মকর্তা জো কেন্ট। হোয়াইট হাউসের প্রধান লক্ষ্য যেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং নৌবাহিনী ও আঞ্চলিক মিত্রদের নিষ্ক্রিয় করা, সেখানে ইসরায়েল হাঁটছে ‘পোড়ামাটি নীতি’তে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, নেতানিয়াহু প্রশাসন ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি দেশটির নিরাপত্তা ও বাসিজ বাহিনীর ওপর সরাসরি আঘাত হানছে, যাতে কোনো অভ্যন্তরীণ গণ-অভ্যুত্থান দমনের শক্তি তেহরানের না থাকে। তবে গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, আকাশপথে ১৬ হাজার যৌথ হামলার পরও ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত এখনও বেশ শক্ত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি সচল করতে এবং চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে শেষ পর্যন্ত স্থল সেনা পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করলেও, ট্রাম্প আপাতত স্থল অভিযানের ঝুঁকি নিতে নারাজ।