• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন

ইসরায়েলে আরব দলগুলো কীভাবে টিকে আছে, প্রভাব কতটা?

নাসিমুল শুভ | বাংলা স্ট্রিম / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট গণনা প্রায় শেষ, এখন পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট এবং গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের কোনোটিই সরকার গঠনের মতো সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায়নি। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য লাগবে ৬১ আসন। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে নেতানিয়াহু জোট ৫৪ আসন এবং আইজেনকোটের জোট ৪৮-৪৯ আসন পেতে যাচ্ছে। এই দুই জোটের বাইরে এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আরব দলগুলো, যারা এবার প্রায় ১৭ থেকে ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে।

এখন ইসরায়েলে কারা সরকারে যাচ্ছে, এই প্রশ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠদের দেশের জাতীয় নির্বাচনে আরব দলগুলোর ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে ওঠা। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে আরব দলগুলোকে ‘কিংমেকার’ তকমাও দিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েলের মতো কট্টর ইহুদিদের দেশে এই আরব দলগুলোর এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠাটা হঠাৎ করে হয়নি। আর হুট করেই দলগুলো এতো ভোট পায়নি।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-মঙ্গলবার জানায়, এবারের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি আরব ভোটারদের উপস্থিতি ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। মূলত ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলের বেদুইনপ্রধান এলাকা, আরব অধ্যুষিত শহর এবং আরব-ইহুদি মিশ্রিত অঞ্চলের ভোটাররা আরব দলগুলোকে বিপুল পরিমাণে ভোট দিয়েছেন।

এই ভোটারদের একটি বড় অংশ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও উগ্রপন্থী জোট সরকারের নীতিগুলোর তীব্র বিরোধী। গাজা ও পশ্চিম তীরে চলমান সামরিক নীতি এবং ইসরায়েলি আরবে ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা ব্যালটের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন।

ইহুদি আধিপত্যের দেশে আরবদের দল!
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৭ লাখ ফিলিস্তিনি (জাতিতে আরব) বাস্তুচ্যুত হন যা ‘নাকবা’ বা বিপর্যয় নামে পরিচিত। কিন্তু তীব্র প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার আরব ফিলিস্তিনি তাঁদের নিজেদের ভিটেমাটিতেই থেকে যান। তাদের ভূখণ্ড ইসরায়েল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এই অবশিষ্ট আরবদের তাড়িয়ে দেওয়া বা তাদের অস্তিস্ত্ব সম্পূর্ণ মুছে ফেলা আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত কারণে সম্ভব ছিল না। নিজেদের ‘উন্নত গণতান্ত্রিক’ ভাবমূর্তির জন্যও এটি ইসরায়েলের দরকার ছিল। ফলে একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই তাদের ইসরায়েলের নাগরিকত্ব দিতে হয়। বর্তমানে ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরব।

১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের আরবরা কঠোর সামরিক শাসনের অধীনে ছিলেন। সে সময় স্বাধীন কোনো আরব দল গঠনের অনুমতি ছিল না। তবে সেসময় ক্ষমতাসীনদের ভোটব্যাংক হিসেবে তাদের বেশ গুরুত্ব ছিল। আরবরা ইহুদিপ্রধান সরকারগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া বজায় রেখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাতেই বেশি মনোযোগী ছিল।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের সংস্পর্শে এসে এবং সামরিক শাসন তুলে নেওয়ার পর ইসরায়েলি আরবদের মধ্যে স্বাধীন রাজনৈতিক চেতনার উদয় হয়। এই ধারায় ১৯৭৭ সালে গঠিত হয় ‘হাদাশ’, যা মূলত ইসরায়েলি কমিউনিস্ট পার্টি ও প্রগতিশীল আরব-ইহুদি গোষ্ঠীর একটি জোট হিসেবে জায়নবাদের বিরোধিতা ও নাগরিক অধিকারের দাবি তোলে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে প্রথম ফিলিস্তিনি ইনতিফাদার সময় ইসরায়েলি দমনপীড়নের প্রতিবাদে লেবার পার্টির আরব সংসদ সদস্য আবদেল ওয়াহাব দারাউশে দল ত্যাগ করে ‘আরব ডেমোক্রেটিক পার্টি (মাদা)’ নামের স্বাধীন ও একক আরব দল গঠন করেন।

এরপর ১৯৯৬ সালের ইসরায়েলি সাধারণ নির্বাচনের আগে তাঁর এই আরব ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ইসরায়েলের ইসলামি আন্দোলনের দক্ষিণ শাখা একত্রে মিলে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন করে। এই নতুন জোটেরই নাম দেওয়া হয় ইউনাইটেড আরব লিস্ট, যা হিব্রু আদ্যক্ষর অনুযায়ী ‘রা’আম নামে পরিচিত। দলটি ফিলিস্তিন ইস্যুর চেয়ে ইসরায়েলের ভেতরের আরবদের গৃহায়ন, অপরাধ দমন ও বাজেটের মতো নাগরিক অধিকার আদায়ের ওপর বেশি জোর দিতে শুরু করে।

এর আগেই ১৯৯৩ সালের ওসলো শান্তি চুক্তির পর ইসরায়েলে আরও আদর্শিক বিভাজন ও আধুনিক আরব দলের জন্ম হয়। এর মধ্যে ‘বালাদ’ সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও কট্টর ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে ইসরায়েলকে একটি ইহুদি রাষ্ট্রের বদলে ‘সব নাগরিকের সমান রাষ্ট্র’ বানানোর দাবি তোলে।

ইসরায়েলে আরব দলগুলো টিকল কীভাবে?
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি ধারা হলো ‘জয়েন্ট লিস্ট’ (জোট) এবং আলাদাভাবে নির্বাচন করা দল ‘রাআম’, যারা ইউনাইটেড আরব লিস্ট নামে পরিচিত। জয়েন্ট লিস্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউসুফ জাবারিন এবং আরব লিস্টের নেতৃত্বে আছেন মনসুর আব্বাস।

২০১৪ সালে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট (নেসেট) একটি নতুন আইন পাস করে, যার মাধ্যমে সংসদে আসন প্রাপ্তির জন্য ভোটের সর্বনিম্ন সীমা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.২৫ শতাংশ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ছোট ছোট আরব দলগুলো যাতে পার্লামেন্টে ঢুকতে না পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এবং আরব ভোট যাতে ভাগ না হয় সেজন্য ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের প্রধান ৪ টি আরব দল—হাদাশ, তা’আল, বালাদ এবং রাআম মিলে ‘জয়েন্ট লিস্ট’ জোট গঠন করে।

২০২১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে মনসুর আব্বাস তাঁর বাস্তববাদী ও নাগরিক অধিকার-কেন্দ্রিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, আরবদের স্বার্থে তিনি প্রয়োজনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ যেকোনো ইহুদিবাদী দলের সাথে আলোচনা করতে প্রস্তুত। সেবছর নির্বাচনে আলাদাভাবে লড়ে রাআম দল ৫টি আসন পায়। নির্বাচনের পর তৎকালীন রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভাঙতে মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম কোনো স্বাধীন আরব দল হিসেবে সরাসরি নাফতালি বেনেট এবং ইয়ার লাপিডের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকারি জোটে যোগ দেন। তাঁর এই সমর্থনের কারণেই তখন দীর্ঘ ১২ বছর পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। যদিও নেতানিয়াহুকে হটানো সরকার বেশিদিন টেকেনি।

এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে জয়েন্ট লিস্টের শরিক দলগুলো আবারও নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আসার আগে অন্যান্য আরব দলগুলো (হাদাশ, তা’আল, বালাদ) আবার ঐক্যবদ্ধ হয় জয়েন্ট লিস্ট গঠন করে। কিন্তু মনসুর আব্বাস তাঁর ২০২১ সালের সফল ‘কিংমেকার’ কৌশলের পুনরাবৃত্তি করতে এবারও জোটের বাইরে থেকে এককভাবে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

এবার আরব দলগুলো ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারছে কি?
ইসরায়েলের নির্বাচনের প্রাথমিক নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, জয়েন্ট লিস্ট ১২ টি আসন এবং মনসুর আব্বাসের রা’আম ৭ থেকে ৮টি আসন পেতে যাচ্ছে।

বুধবার জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন বলেন, নেতানিয়াহুর উগ্র ডানপন্থী জোট সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানোর দায়িত্ব নিতে তাঁর দল প্রস্তুত। এই সরকার প্রত্যেক আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

একই দিনে জয়েন্ট লিস্টের আরেক নেতা আহমেদ তিবি বলেন, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তাঁদের জোট বিরোধী শিবিরের (আইজেনকোটের জোট) দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে ইসরায়েলের ক্ষমতার কাছাকাছি আসা দুই জোটের কাউকেই এই আরব দলগুলোকে কাছে টানতে দেখা যাচ্ছে না।

অথচ নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট সরকার গঠন করতে চাইলে তাদের জন্য সহজ উপায় আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া। কিন্তু বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরবদের সমর্থনে সরকার গঠনের কথা নাকচ করে দিয়েছেন।

বুধবারই নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দেন, ‘সরকার গঠনের জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করা হবে একটি লজ্জা এবং কলঙ্কজনক বিষয়। ইসরায়েলকে ঝুঁকিতে ফেলা এবং ইহুদি রাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বিরোধিতাকারী এবং জায়নবাদ-বিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে কোনো সরকার গঠিত হতে পারে না।’

নেতানিয়াহুর পাশাপাশি আইজেনকোট-জোটের বেশিরভাগ দলও অভিন্ন মূল্যবোধের অভাব এবং নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি সরকারে যাওয়ার বিষয়টি নাকচ করেছে। যার ফলে ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আপাতত থেকেই যাচ্ছে।

– বাংলা স্ট্রিম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category