বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক শীর্ষ পদ উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এক নেতিবাচক চর্চা হলো মেধা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ‘নীল দল’ বা দলীয় সমর্থক শিক্ষকদের এই পদে বসানোর যে রীতি দেখা গিয়েছিল, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলেও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেশের শিক্ষানুরাগী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা খাতে দলীয়করণের এই বিষাক্ত চর্চার অবসান ঘটবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগ সেই প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিয়েছে।
পুরোনো পথেই নতুন সরকারের যাত্রা
সম্প্রতি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১৫ মার্চ দেশের আটটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশই সরাসরি ক্ষমতাসীন বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন, বিশেষ করে ‘সাদা দল’ বা সমমনা সংগঠনের বর্তমান অথবা সাবেক শীর্ষ নেতা। এর ফলে দেশের উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নতুন করে গভীর বিতর্কের জন্ম হয়েছে।
নিয়োগ পাওয়া উপাচার্যদের রাজনৈতিক পরিচয়গুলোর দিকে তাকালে এই দলীয়করণের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি): দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি সরাসরি বিএনপির কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি): এই প্রতিষ্ঠানে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলামকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি): এখানে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি): বর্তমান শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রইস উদ্দিন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি): সাদা দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানকে এখানে উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট): গত বছরের এপ্রিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদকে উপাচার্য পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় তাকেই এই পদে বসিয়েছে।
মন্ত্রীর সাফাই এবং বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা
এই বিতর্কিত নিয়োগগুলোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সাফাই গেয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি এই নিয়োগগুলোকে সমর্থন করে প্রশ্ন রাখেন, “একজন লোকের রাজনীতি করা কি অপরাধ? এটি কি তাদের ডিসকোয়ালিফিকেশন (অযোগ্যতা)?” তিনি দাবি করেছেন যে, প্রার্থীদের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী এই নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষামন্ত্রীর এই যুক্তির কড়া সমালোচনা করেছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে মন্ত্রীর দ্বৈতনীতির কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষামন্ত্রী মাত্র একদিন আগেই বলেছিলেন যে শিক্ষা কারও ব্যক্তিগত বা দলীয় বিষয় নয়, এটি সবার মৌলিক অধিকার। অথচ তার ঠিক একদিন পরই দেশের ৭-৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ দলীয় ভিত্তিতে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হলো। অধ্যাপক মামুন আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এর আগে শিক্ষামন্ত্রী সার্চ কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভিসি নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার অভিযোগ
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান ও রীতিনীতি থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না:
সিনেট প্যানেলের অবমূল্যায়ন: ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী সিনেট প্যানেলের মাধ্যমে ভোটাভুটির ভিত্তিতে উপাচার্য নির্বাচনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
সার্চ কমিটির ব্যর্থতা: ২০২৫ সালের মে মাসে একটি ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করে কুয়েটে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
অধ্যাদেশের লঙ্ঘন: ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব আইন মেনে একাডেমিক শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন কাউকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও, রাজনৈতিক পরিচয়ই এখন প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দলীয় নিয়োগে উচ্চশিক্ষার সংকট ও ঝুঁকি
শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় পরিচয়ে উপাচার্য নিয়োগ দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য এক অশনিসংকেত। এর ফলে নানামুখী দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়:
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা হারানো: উপাচার্য যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারী হন, তখন তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো আর নিরপেক্ষ থাকে না।
দলীয় নিয়োগ বাণিজ্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রশাসনিক কাজ, বিশেষ করে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ, উপাচার্যের একক নিয়ন্ত্রণে থাকে। দলীয় উপাচার্য থাকলে যোগ্যতার বদলে কেবল দলীয় অনুসারীদের নিয়োগ দেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়, যা শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে।
গবেষণার চেয়ে রাজনীতিতে মনোযোগ: মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন না থাকায় যোগ্য শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে পদোন্নতি বা প্রশাসনিক পদের আশায় শিক্ষকরা গবেষণার চেয়ে দলীয় রাজনীতিতে বেশি সময় ব্যয় করতে উৎসাহিত হন।
প্রশাসনিক অস্থিরতা ও অভিভাবকহীনতা: রাজনৈতিক নিয়োগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সরকারের পতনের সাথে সাথে প্রশাসনের পতন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্যরা বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন অথবা তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। গত ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে চরম অভিভাবকহীনতা তৈরি হয়েছিল, তা এর জ্বলন্ত প্রমাণ।
মুক্তবুদ্ধি চর্চায় বাধা: ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও বৈষম্যমূলক আচরণ ক্যাম্পাসের মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবেশকে চরমভাবে বিষিয়ে তোলে এবং স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন বিঘ্নিত করে।
উন্নত বিশ্বের দৃষ্টান্ত
বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য বা শীর্ষ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বচ্ছ:
পাশ্চাত্যের দেশগুলো: হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রার্থীর গবেষণার গভীরতা, আন্তর্জাতিক জার্নালে তার প্রকাশনা এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ‘একাডেমিক ভিশন’ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়। এই পদের জন্য প্রার্থীদের একাধিক ধাপের ইন্টারভিউ পার হতে হয়, এমনকি শিক্ষার্থীদের সরাসরি প্রশ্নেরও মুখোমুখি হতে হয়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত: ভারতের মতো পার্শ্ববর্তী দেশেও উচ্চপর্যায়ের সার্চ কমিটি গঠন করে কয়েক মাস ধরে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর উপাচার্য পদের জন্য নাম সুপারিশ করা হয়।
ভবিষ্যৎ করণীয় ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের কোনো দালান নয়; এটি একটি জাতির চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। এই বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্রের নেতৃত্ব দলীয় পরিচয়ে নির্ধারিত হওয়া নিয়ে বহুদিন ধরেই তীব্র আপত্তি উঠছে। একজন উপাচার্য হবেন এমন ব্যক্তিত্ব, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ এবং যার একাডেমিক ও প্রশাসনিক যোগ্যতা প্রশ্নাতীত।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি স্থায়ী ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করতে হবে। এই কমিটির মাধ্যমেই সবদিক বিবেচনা করে সবচেয়ে যোগ্য মানুষটিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি, উপাচার্যের একক ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার জন্য ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ বা সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর যুগোপযোগী সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।