বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং একের পর এক যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এক গভীর অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান তীব্র সংঘাত এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ এক অভাবনীয় জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার থেকে যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ নিজেদের বিশাল শক্তির চাহিদা মেটাত, তা এখন চরমভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য হয়ে আবারো পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। তবে এই নির্ভরতা একেবারে নতুন কিছু নয়; বরং পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, দেশের স্থানীয় গ্যাস উত্তোলন থেকে শুরু করে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনার এক বিশাল এবং অঘোষিত সাম্রাজ্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে রয়েছে।
বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ সম্পদের ব্যবহার এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের চিত্রটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানকার সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন বহুজাতিক জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন। দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে সরাসরি এই মার্কিন কোম্পানির পরিচালিত ক্ষেত্রগুলো থেকে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, স্থানীয় উৎপাদন থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন গড়ে মোট ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, কেবল শেভরন পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেই প্রতিদিন ৯৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে, যা দেশের মোট স্থানীয় গ্যাস উত্তোলনের ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে, আমদানি করা এলএনজিসহ দেশে প্রতিদিন গড়ে মোট ২ হাজার ৬৬০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যেখানে এই বহুজাতিক মার্কিন কোম্পানির একক হিস্যা রয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ।
দেশে বর্তমানে মোট ২০টি ফিল্ড বা গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনের কাজ চলছে। এই ফিল্ডগুলোর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে শেভরন পরিচালিত বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড। দেশের মোট উত্তোলিত গ্যাসের প্রায় ৪৮ শতাংশই আসে কেবল এই একটি ফিল্ড থেকে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই নির্ভরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, শেভরন পরিচালিত এই বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ড একাই এতকাল দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে স্বাভাবিক রেখেছে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে এই ফিল্ডের মজুত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। ফিল্ডটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যেই ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, যদি কোনো কারণে জাতীয় গ্রিডে বৃহৎ আকারে বিবিয়ানার এই গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ করে কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ভারী শিল্প খাত এক নজিরবিহীন ও তীব্র ঝুঁকির মুখে পতিত হবে, যার প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের এই একচেটিয়া আধিপত্যের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯৫ সালে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি চুক্তির আওতায় তারা প্রথম দেশের অনশোর ব্লক ১২-তে কাজ করার অনুমতি লাভ করে। এর ঠিক তিন বছর পর, ১৯৯৮ সালে এই ব্লকেই যুগান্তকারী বিবিয়ানা ফিল্ডটি আবিষ্কৃত হয়। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২০০৭ সালে এই ফিল্ড থেকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়, যা ধারাবাহিকভাবে গত ১৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের জ্বালানি খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছে। এই সুবিশাল বিবিয়ানা ছাড়াও শেভরন দেশের আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড—জালালাবাদ ও মৌলভীবাজার গ্যাসফিল্ড থেকে নিয়মিত গ্যাস উত্তোলন করে যাচ্ছে। এই দুটি ফিল্ড থেকে প্রতিদিন যথাক্রমে ১৩১ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের গ্যাস খাতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর একাধিপত্য কেবল ভূগর্ভস্থ গ্যাস উত্তোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির পর তা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার পুরো অবকাঠামোতেও মার্কিন কোম্পানিগুলো বড় পরিসরে কাজ করে যাচ্ছে। বিদেশ থেকে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় তরল করে আনা এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য রিগ্যাসিফিকেশন বা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার প্রয়োজন হয়। এই কাজের জন্য সমুদ্রের বুকে ভাসমান টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ব্যবহার করা হয়। দেশে বর্তমানে এমন দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে, যার মধ্যে একটি স্থাপন ও পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নামকরা প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত এই টার্মিনালটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দেশে যখন গ্যাস সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল, তখন প্রথম যে এলএনজি টার্মিনালটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি এই এক্সিলারেট এনার্জির মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা হয়। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলার সঙ্গে এক্সিলারেট এনার্জির এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি সই হয়। এরপর যাবতীয় কারিগরি কাজ শেষে ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট থেকে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। বর্তমানে দেশে দৈনিক মোট ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে, যার অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতাই এক্সিলারেট এনার্জির একক নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশে এলএনজি সরবরাহের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করছে। পেট্রোবাংলার সঙ্গে তাদের এই গ্যাস সরবরাহের চুক্তিটি ১৫ বছর মেয়াদি, যা দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন উপস্থিতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করেছে। শুধু তাই নয়, চুক্তিবদ্ধ সরবরাহের পাশাপাশি এক্সিলারেট এনার্জি আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও পেট্রোবাংলাকে এলএনজি সরবরাহ করে দেশের আপৎকালীন চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে যখন প্রথাগত উৎসগুলো থেকে জ্বালানি পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তখন বাংলাদেশ সরকার বিকল্প পথের সন্ধানে নেমেছে। এই সংকট মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি সহযোগিতা চেয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সম্প্রতি ঢাকা সফরে আসা দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে সচিবালয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
বৈঠকে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মার্কিন প্রতিনিধিদের কাছে দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে সারা পৃথিবীতেই জ্বালানির এক তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। আগের যেসব কমিটমেন্ট বা চুক্তি ছিল, সেই অনুযায়ী জ্বালানি আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে, সেটিই ছিল আলোচনার মূল বিষয়। মন্ত্রী মার্কিন প্রতিনিধিদের এই বার্তাও দিয়েছেন যে, বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি খাতে কাজ করতে আগ্রহী, তবে বর্তমানের এই জরুরি অবস্থা সামাল দিতে তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন। মার্কিন প্রতিনিধিরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাদের হেড অফিসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পক্ষ থেকেও এই বৈঠকের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। তারা জানিয়েছে, এই সাক্ষাতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের সর্বত্র সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে একটি নির্ভরযোগ্য ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
এই নির্ভরতা ও সম্পর্কের পালে নতুন হাওয়া জুগিয়েছে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছর মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি জ্বালানি আমদানির বিষয়টি একটি চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ আগামী দেড় দশকে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন জ্বালানি ক্রয় করবে অথবা দেশীয় কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এই বিশাল অঙ্কের ক্রয় প্রক্রিয়াকে সহজতর করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। এই বিশাল পরিকল্পনার মধ্যে মার্কিন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ‘অফট্র্যাক এগ্রিমেন্ট’ বা অগ্রিম ক্রয়চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সবকিছু মিলিয়ে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি কূটনীতিতে ওয়াশিংটন এখন ঢাকার সবচেয়ে প্রধান এবং কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠছে।
দেশের জ্বালানি খাতের এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বিশাল অঙ্কের চুক্তির বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত কৌশলী এবং বাস্তবসম্মত অবস্থান গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, বর্তমানের এই জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বা দুটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর না করে জ্বালানি উৎসের সর্বোচ্চ বহুমুখীকরণ ছাড়া দেশের সামনে আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. তামিম এই পরিস্থিতির একটি বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের গ্যাস খাতে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, তাই এখন প্রয়োজন পড়লে যেকোনো উৎস থেকেই গ্যাস সংগ্রহ করতে হবে। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে এবং বিকল্প উৎসগুলো থেকেও সেই অর্থে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যে পড়ে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে কৃচ্ছ্রসাধনের পথেই হাঁটতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প ও অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ার আগেই সরকারকে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে অল্প করে হলেও পরিকল্পিত লোডশেডিংয়ের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
অন্যদিকে, কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে দেখছেন ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে। তাদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ কবে থামবে এবং এর স্থায়িত্ব কতদিন হবে, তা নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তাই বর্তমানে দেশের প্রধান এবং একমাত্র অগ্রাধিকার হওয়া উচিত যেকোনো মূল্যে ‘আপৎকালীন সরবরাহ’ নিশ্চিত করা। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের মতে, জ্বালানি এখন আর কেবল একটি সাধারণ ব্যবহার্য পণ্য নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কৌশলগত উপাদান’। তাই সংকটের এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যেকোনো বড় শক্তির কাছ থেকে দামের বিষয়টি খুব বেশি বিবেচনা না করে জ্বালানি কেনাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এতে করে একটি কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়। তিনি আরও মনে করেন, যেহেতু বাংলাদেশ দিন দিন আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে, তাই সাশ্রয়ী মূল্য বা ‘কস্ট অ্যান্ড প্রাইস’ এবং নিশ্চিত সরবরাহ বা ‘গ্যারান্টেড সাপ্লাই’—এই দুটি বিষয় যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রেই নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজার যখন স্থিতিশীল হবে, তখন কাতার এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের দেওয়া মূল্যের মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের হাতে থাকবে। তাই সাময়িক এই নির্ভরতায় তিনি বড় কোনো ঝুঁকি দেখছেন না, বরং এটিকে সময়ের দাবি হিসেবেই আখ্যায়িত করেছেন।