• রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

রাজসাক্ষীর নেপথ্যে

Reporter Name / ৩ Time View
Update : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট প্রকাশের পর দেশে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনি কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এই বিচার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সাবেক পুলিশ প্রধান বা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কীভাবে এই প্রক্রিয়ায় ‘রাজসাক্ষী’ বা রাষ্ট্রের সাক্ষী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং এর আইনি সীমাবদ্ধতা ও সুবিধাই বা কী? আইনি পরিভাষায় যাকে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা ‘কিং’স এভিডেন্স’ বলা হয়, তা মূলত অপরাধের জটিল জাল ভেদ করার একটি আইনি হাতিয়ার।

বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো অপরাধের সাথে জড়িত ব্যক্তিকে অপরাধের মূল হোতাদের বিচারের স্বার্থে সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। যখন কোনো অপরাধের তথ্য সাধারণ উপায়ে উদ্ঘাটন করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রপক্ষ অভিযুক্তদের মধ্যে একজনকে সাক্ষী হিসেবে প্রস্তাব দিতে পারে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৩৭ ধারা অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শর্তসাপেক্ষে ক্ষমা প্রদর্শনের আদেশ দিতে পারেন। তবে এই সুযোগ পাওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিকে পুরো ঘটনার বিস্তারিত এবং অকাট্য সত্য ঘটনা আদালতের সামনে উন্মোচন করতে হয়। এটি নিছক কোনো ক্ষমা পাওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং সত্য উদঘাটনের মাধ্যমে বৃহত্তর অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

জুলাই মাসের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়কার হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো পরিকল্পিত কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের তদন্ত চলছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দীর্ঘদিনের নিপীড়নের যে ধারা, তার সাথে এই জুলাইয়ের ঘটনাবলি সরাসরি সম্পর্কিত। এ ধরনের জটিল ও পরিকল্পিত অপরাধের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা যখন মনে করে যে পুলিশ বা প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সরাসরি নির্দেশ পাওয়া ব্যক্তিরা যদি সাক্ষ্য দেন, তবে মূল পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে—তখনই রাজসাক্ষীর বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা কার নির্দেশে এবং কী ধরনের প্রোটোকল মেনে নির্বিচারে বলপ্রয়োগ করেছেন, তার চেইন অব কমান্ডের অকাট্য প্রমাণ কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছেই থাকতে পারে।

রাজসাক্ষী হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আইনি ঝুঁকিযুক্ত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শুরুতেই স্বীকার করতে হয় যে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এরপর তাকে আদালতের কাছে আবেদন করতে হয় এবং আদালত যদি মনে করেন তার সাক্ষ্য ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরিহার্য, তবেই তাকে ক্ষমা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। এখানে একটি বড় ঝুঁকি থাকে যে, রাজসাক্ষী হওয়ার পর যদি ওই ব্যক্তি তার দেওয়া জবানবন্দি থেকে সরে আসেন বা মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন, তবে তার আগের স্বীকারোক্তিই তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আইনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই ঝুঁকি থাকার কারণেই রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্তটি অভিযুক্তদের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মতো।

আন্তর্জাতিক রিপোর্টটি মূলত একটি আন্তর্জাতিক চাপ হিসেবে কাজ করছে, যা বলছে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে। রাজসাক্ষীর মাধ্যমে ঘটনার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে, এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এতে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার পরিবর্তে আইনের শাসনের বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে রাজসাক্ষী হওয়া মানেই অপরাধ থেকে মুক্তি নয়, বরং বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্রের একটি বিশেষ আইনি কৌশলের অংশ হওয়া। জুলাই অভ্যুত্থানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যে ন্যায়বিচারের দাবি করছে, তা নিশ্চিত করতে আইনি সব পথ খোলা রাখতে হবে। যদি ক্ষমতার বলয়ে থাকা ব্যক্তিরা সত্য উদঘাটনে সহায়তা করেন, তবেই এই বিচার প্রক্রিয়া কেবল আইনি লড়াইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজসাক্ষীর আইনটি ব্যবহারের সুযোগ কতটা আছে এবং তা কতটা নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে পরিশেষে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সত্যের জয় নিশ্চিত করাই এই বিচার প্রক্রিয়ার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category