সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ দেশের আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগাম নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত জোটগত রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এবার সম্পূর্ণ এককভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে দলটি অনেক আগেই তাদের প্রার্থী তালিকা সুনির্দিষ্ট করে মাঠপর্যায়ে নামিয়ে দিয়েছে। সাধারণ পদের পাশাপাশি সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য পদে জামায়াতের নারী প্রার্থীরা এখন পুরোদমে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। সাম্প্রতিক ধর্মীয় উৎসবের ছুটি ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা দেশজুড়ে ব্যাপক গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনকে জামায়াত মাঠপর্যায়ে নিজেদের প্রকৃত জনসমর্থন, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভিত্তি পরখ করার একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের বড় বড় শহর ও গ্রামীণ জনপদে দলটির একক ভোটব্যাংকের সামর্থ্য মূল্যায়ন করাই এই নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য। জোটের ওপর নির্ভর না করে এককভাবে লড়লে মাঠপর্যায়ে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের সক্রিয়তা বহুগুণ বাড়বে এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও মজবুত হবে বলে মনে করছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
দলীয় নথিপত্র ও সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশের মোট ১২টি সিটি করপোরেশনের প্রতিটিতেই একক মেয়র প্রার্থী দেবে জামায়াত। স্থানীয় জেলা ও মহানগর শাখাগুলোর পাঠানো তালিকা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ইতোমধ্যে ১২ জন সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করেছে। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে প্রথম ধাপে বেশ কয়েকটি সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম তৃণমূলের কর্মী সমাবেশের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মহানগর জামায়াতের আমির ও সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল জব্বার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনে হাফিজুর রহমান এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নগর শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালী। ঢাকার দুই সিটির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা না হলেও, ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলটির ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েমের নাম অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানা গেছে। দলের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, বাকি সিটি করপোরেশনগুলোর প্রার্থীদের নামও খুব দ্রুত স্থানীয় জোনাল সমাবেশের মাধ্যমে ভোটারদের সামনে আনা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম এই নির্বাচনী কৌশলের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে জামায়াত এককভাবে অংশ নেবে। অন্য কোনো দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা বা জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়টি এখন পর্যন্ত দলের চিন্তায় নেই। অন্য দলগুলোও যার যার মতো এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে দলীয়ভাবে নারী ও পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ শতাংশ প্রার্থী সুনির্দিষ্ট করা হয়ে গেছে এবং নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার আগেই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ভোটারদের সামনে প্রকাশ করা হবে।
মাঠপর্যায়ের চিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি এবং এর পরবর্তী সময়টিকে জামায়াতের প্রার্থীরা জনসংযোগের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত ইউনিয়নে প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করে সাধারণ ভোটার, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাটবাজার, রাস্তাঘাট এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ছবি ও শুভেচ্ছাসংবলিত বিশাল বিশাল ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার শোভা পাচ্ছে। উৎসবের দিনগুলোতে প্রার্থীরা বিভিন্ন পাড়ামহল্লায় গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করছেন, খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। ঈদ পুনর্মিলনী, গ্রামীণ অঞ্চলের বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, ইমাম ও ওলামা মাশায়েখদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক মিলনমেলাগুলোতে জামায়াত প্রার্থীদের উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে, যেখানে প্রার্থীরা দলীয় মতাদর্শের পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়নে তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছেন।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন