বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তা যেকোনো দেশের অস্তিত্ব ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোনো বৃহৎ তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি গড়ে না ওঠায় এই সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) মিরপুর সেনানিবাসের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে (এনডিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশের নাজুক জ্বালানি পরিস্থিতি ও জাতীয় নিরাপত্তার নানাদিক নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে তার এই সতর্কবার্তা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জরুরি বার্তা বহন করে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে সেনাপ্রধান জানান, দেশে বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানির বিপুল চাহিদা থাকলেও আমাদের সম্বল মাত্র একটি শোধনাগার— ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক খাতের নানামুখী তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা যেখানে ৭০ লাখ টনেরও বেশি, সেখানে ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই রিফাইনারিটি পরিশোধন করতে পারে মাত্র ১৫ লাখ টনের মতো। বাকি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি চড়া মূল্যে পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। বছরের পর বছর ধরে দ্বিতীয় রিফাইনারি (ইআরএল-২) নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে থাকায় একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে রাষ্ট্র।
জ্বালানি নিরাপত্তার এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার বক্তব্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কেন্দ্রিক উত্তেজনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-বিশাল অংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত জলপথে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা অবরোধ সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ধস নামাতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরাও বারবার সতর্ক করছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এবং মূল্যস্ফীতিতে।
অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের ওপরও জোর দিয়েছেন সেনাপ্রধান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই প্রাণকেন্দ্রকে সুরক্ষিত রাখতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণে বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। একইসাথে পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশলের সাথে তাল মেলাতে তিনি বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। “আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিই যুদ্ধ করার জন্য নয়, বরং যুদ্ধ এড়ানোর জন্য”— সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য জাতীয় প্রতিরক্ষার মূল দর্শনকে তুলে ধরে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশের পক্ষেই স্বাধীন ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সামরিক সক্ষমতাই মূলত আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে রোহিঙ্গা সংকটের কথাও জোরালোভাবে উঠে আসে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনী এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর যে পাহাড়সম চাপ তৈরি করেছে, তা মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে আরও বেশি সম্পৃক্ত ও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মিরপুর সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত তিন সপ্তাহব্যাপী (৫ থেকে ২৩ এপ্রিল) ‘ক্যাপস্টোন কোর্স ২০২৬/১’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ৪৫ জন ফেলোর মাঝে সনদপত্র বিতরণ করেন সেনাবাহিনী প্রধান। এই কোর্সে সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. ফয়জুর রহমান জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অব্যাহত সংলাপ ও জাতীয় ঐকমত্য গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
ক্যাপস্টোন কোর্সের মতো উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণগুলো মূলত রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কৌশলগত সচেতনতা বৃদ্ধি, আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা জোরদার এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সেনাপ্রধান আশা প্রকাশ করেন, এই কোর্সের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও নেতৃত্বের মেলবন্ধন কাজে লাগিয়ে অংশগ্রহণকারীরা আগামী দিনে দেশের উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং একটি সুদৃঢ় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনী ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই— সেনাপ্রধানের এই বার্তাই যেন পুরো আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছে।