• বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

এলপিজি আমদানি করতে চান শিল্পমালিকরা

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা এখন রীতিমতো খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। কারখানার পাইপলাইনে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় বয়লার, চুল্লি ও অন্যান্য ভারী উৎপাদনযন্ত্র স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখার মতো ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে শিল্পমালিকরা এখন বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছেন। তবে কেবল স্থানীয় বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলপিজি কিনেই তারা ক্ষান্ত হচ্ছেন না, বরং উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজেদের প্রয়োজনীয় এলপিজি তারা নিজেরাই সরাসরি আমদানি করতে চাইছেন। এরই মধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজেদের ব্যবহারের জন্য সরাসরি এলপিজি আমদানির আনুষ্ঠানিক অনুমতি চেয়ে সরকারের জ্বালানি বিভাগে আবেদন জমা দিয়েছে।
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ঠিক কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা সাম্প্রতিক কিছু সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। গত ২৮ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের মোট দৈনিক চাহিদা ছিল ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় খনি থেকে এসেছে ১৬১ কোটি ৪০ লাখ এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে এসেছে ৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ, প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১৪২ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। এই বিপুল ঘাটতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। ২৯ আগস্টের তথ্য বলছে, জাতীয় গ্রিডে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে বিটিএমএর পরিচালক ও লিটল গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের অভাবে কারখানাগুলো তাদের স্বাভাবিক উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তাদের বিকল্প ও দামি জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদনের সামগ্রিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্প মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে এবং রপ্তানি খাত বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে এর আমদানির পরিমাণও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বর্তমানে টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, কাচ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ওষুধ ও ধাতুশিল্পের মতো ভারী কারখানাগুলোতে বয়লার, ড্রায়ার ও তাপ উৎপাদনের কাজে এলপিজির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেলেও ট্যাঙ্কে মজুত থাকা এলপিজি দিয়ে অনায়াসেই উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব। সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১৪ লাখ ২৬ হাজার ৮৬০ টন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫৭ টনে। বিপরীতে একই সময়ে দেশে সরকারিভাবে এলপিজি উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ৩৮৬ টন। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মিলিয়ে দেশে মোট সরবরাহ ছিল ১৫ লাখ ৯৪ হাজার টন, যার ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশই এখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানির জন্য ২৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন থাকলেও গত অর্থবছরে মূলত ১৭টি প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল এবং তারা মোট ১৭ লাখ ৬ হাজার ২০০ টন এলপিজি আমদানি করে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০টি কোম্পানিই মোট আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ (১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন) একাই নিয়ন্ত্রণ করছে। আমদানির শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ওমেরা এনেছে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৩ টন, মেঘনা ফ্রেশ এনেছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ টন, যমুনা স্পেসটেক এনেছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টন এবং বিএম এনার্জি এনেছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টন।
বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এলপিজি কেনার চেয়ে সরাসরি আমদানি করাকে অনেক বেশি লাভজনক ও নিরাপদ বলে মনে করছেন শিল্পমালিকরা। তাদের প্রধান যুক্তি হলো, বৃহৎ পরিসরে সরাসরি এলপিজি আমদানি করতে পারলে জ্বালানি খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাছাড়া কারখানার নিজস্ব মজুত ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত এলপিজি সংরক্ষণ করা গেলে গ্যাস লাইনের চাপের ওপর আর নির্ভর করতে হবে না, ফলে সরবরাহের অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত হবে। শিল্পমালিকদের এই আগ্রহের পালে হাওয়া দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলপিজিকে সরাসরি ‘শিল্প কাঁচামাল’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ দেওয়ায় এর আমদানিতে ব্যাংক থেকে ঋণ বা অর্থায়ন পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্ম সচিব মো. মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানা সচল রাখতে মালিকদের সরাসরি এলপিজি আমদানির আবেদনগুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখছে।
সরাসরি এলপিজি আমদানি শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ বেশ কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ওমেরা এলপিজির মালিকানা প্রতিষ্ঠান ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী মনে করেন, কেবল চাইলেই রাতারাতি যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করতে পারবে না। এর জন্য কারখানায় বিশাল স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ভ্যাপোরাইজার, নিরাপদ পাইপলাইন ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, যার জন্য শুরুতেই বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও ছাড়পত্র জোগাড় করাও বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের নীতিমালায় এলপিজি আমদানির কঠোর শর্তাবলির কথা উল্লেখ করে তিনি একটি ভিন্ন পথের পরামর্শ দেন। তার মতে, সরকার চাইলে নতুন করে আমদানির অনুমতি না দিয়ে শিল্পমালিকদের সঙ্গে বিদ্যমান এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সরাসরি সংযোগ বা করপোরেট চুক্তির ব্যবস্থা করে দিতে পারে। এতে করে কারখানাগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাবে এবং তাদের বিশাল অঙ্কের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ থেকেও বেঁচে যাবে।
গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে এলপিজি দেশের শিল্প খাতকে হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরেক দফা ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। দেশীয় এলপিজি উৎপাদন একেবারেই নগণ্য হওয়ায় এই খাতের পুরোটাই বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দামের ওঠা-নামা, ডলারের তীব্র সংকট ও অস্থিতিশীল বিনিময় হার, বৈশ্বিক জাহাজভাড়া এবং আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের সরাসরি আঘাত এসে পড়বে দেশের শিল্পের ঘাড়ে। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে গিয়ে দেশ এখন এলপিজির রূপে নতুন এক আমদানিনির্ভরতার দুষ্টচক্রে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর না দিয়ে কেবল আমদানিনির্ভর সমাধান খুঁজলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক কোনো ফল বয়ে আনবে না।
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category